ব্রেলভী বা রেজভী মতবাদ

 

ব্রেলভী বা রেজভী মতবাদ

 

images (1)

কাদিয়ানিদের পর উপমহাদেশে বৃটিশ আমলে দ্বিতীয় যে ভ্রান্ত মতবাদ প্রতিষ্ঠা হয় তা হল “ব্রেলভী বা রেজভী মতবাদ”  উপমহাদেশে কবর বা মাজার কেন্দ্রিক শির্ক বিস্তারে প্রধান ভুমিকা রাখেন এই ‘ব্রেলভী বা রেজভী’ মতবাদ। এরাই মিলাদ, কিয়াম, মাজারপুজা, কবরপূজা, ব্যক্তিপূজা, আল্লাহর সাথে শিরক, রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আল্লাহর সমান মর্জাদা প্রদান করে (রসূল গায়ের জানেন, হাজির নাজির)। পক্ষান্তরে রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রেমিক সেজে, তার সম্মানের মুখরোচক স্লোগান দিয়ে, সুন্নত অবমাননা করে। এবং বিদআত সৃষ্টির মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত অস্বীকার করে। কাজেই এই দলের আকিদা, বিশ্বাস, আমল এবং তাদের কার্জ কালাপ সম্পর্কে জানা দরকার। তাদের সম্পর্কে জানতে পারলে তাদের ভ্রান্তি মাখা দাওয়াত পরিহার করে চলা সম্ভব। সেই সাথে সাধারন মুসলীম যাদের ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান কম, তাদের ও সতর্ক করা সম্ভব হবে। বাংলদেশ তার অনুসরির সংখ্যা কম নয়, তবে পাকিস্তার ও ভারতে তার অনুসারির সংখ্যা অনেক। তাদের আকিদায় মারাত্ত্বক বিভ‌্রান্তি লক্ষ করা যায়। তারা সুফিবাদে বিশ্বাসি। এবং সুফিদের আকিদায় যে সকল ভ্রান্তি লক্ষ করা যায়, উহার সবগুলি ভ্রান্তিতে তারা জড়িত। সুফিদের আকিদা আর ‘ব্রেলভী’ আকিদা মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ। ব্রেলভীদের মূল আক্বীদার ভিত্তি হানাফী মাযহাবের অনুসারী। কিন্তু তাদের বিশ্বাসের মূল সৌধ নির্মিত হয়েছে  শী‘আ সম্প্রদায় কেন্দ্রিক। তাদের বিশ্বাসের মূলে কিছু শীয়াদের ভ্রান্ত আক্বীদা ও বিশ্বাস ও পরিলক্ষিত হয়।  ফলে দেখা যায় তাদের আমল-আক্বীদায় শী‘আদের মতবাদের ব্যাপক প্রভাব। অর্থাৎ তাদের আকিদা জগাখিচুরির মত।

 

তারা চারটি উৎস থেকে তাদের আকিদা গ্রহন করছে।

ক. দক্ষিণ এশীয় হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নিকট থেকে।

যেমন: প্রাচ্য দর্শন ভিত্তিক আকিদা। মৃত্যুর পর মানুষে আত্মা পার্থিব জীবনের ভাল মন্দ পৌছানের ক্ষমতা রাখে।

খ. খ্রিস্টানদের নিকট থেকে

যেমন: হুলূল বিশ্বাসি, সাধনার এক পর্যায় আল্লাহ মানুষের দেহে হুলূল করে বা ‘মানুষের দেহে আল্লাহর অনুপ্রবেশ’ করে। খ্রিস্টানদের বিশ্বাস ঈসা আলাইহিস সালাম স্বয়ং ঈশ্বর। বড় দিনের আদতে ঈদে মিলাদুন নব্বী পালন করা, ক্যারলের মত গান করা।

গ. সুফিদের নিকট থেকে

যেমন: ওয়াহদাতুল উজূদ বা সর্বেঈশ্বরবাদ যা হুলূল-এর পরবর্তী পরিণতি। আল্লাহর সত্তার মধ্যে বান্দার সত্তা বিলীন হয়ে যাওয়া। তাদের দৃষ্টিতে পৃথিবীতে অস্তিত্ববান সব কিছুই আল্লাহর অংশ। আল্লাহ পৃথক কোন সত্তার নাম নয়।(নাঊযুবিল্লাহ)।
ঘ. শিয়াদের নিকট  থেকে

যেমন: মাজার কেন্দ্রিক বিভিন্ন উৎসব ও ইবাদাত ও আহলে বাইয়াকে নিয়ে বাড়াবাড়ি।

 

কাদিয়ানি ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা যেমন মির্জা গোলাম আহমেদ কাদিয়ানি ঠিক তেমনি এই ‘ব্রেলভী বা রেজভী’ মতবাদটি প্রতিষ্ঠা করেন শাহ আহমদ রেজা খাঁন নামের এক ভারতীয়। যেহেতু এই মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা শাহ আহমদ রেজা খাঁন, সুতারং তার রেজা নাম থেকে রেজভী শব্দটি উত্পত্তি হয়েছে। আবার তিনি যেহেতু ‘ব্রেলভী’ শহরে জন্ম গ্রহণ করেন, সুতারং তার জম্ম স্থানের নাম অনুসারে এই মতবাদটি কে ‘ব্রেলভী’ নামেও নাম করন করা হয়। তার অনুসারিরা তাকে ‘আলা হযরত’ হিসাবে পরিচয় দেন। বেরেলভী মতবাদের অনুসারীদের কাছে এ দলের নাম ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত’ বা সুন্নী মুসলিম। নিজেদেরকে তারা সুন্নী ইসলামের অনুসারী প্রমাণ করার জন্য এ নাম ব্যবহার করে। তবে অন্যদের কাছে দলটি ‘‘ব্রেলভী’’ নামেই সমধিক পরিচিত। তাদের ভ্রান্ত আকিদা বিশ্বাস সম্পর্কে জানতে হলে প্রথমে তাদের প্রতিষ্ঠাতা আহমদ রেজা খাঁনের জীবন সম্পর্কে জানতে হবে। তিনি কিভাবে, কখন, কেন এই মতবাদ সৃষ্টি করলেন? উত্তর জানতে পারলেই, এই মতবাদের সরূপ উম্মচন করা সম্ভব হবে বলে আশা করি।

 

শাহ আহমদ রেজা খাঁন

‘ব্রেলভী বা রেজভী’ মতবাদটি প্রতিষ্ঠা করেন শাহ আহমদ রেজা খাঁন। তিনি ১৮৫৬ সাল মোতাবেগ ১২৭২ হিজরীরর ভারতের উত্তর প্রদেশের ব্রেলভী শহরে যাচুলী গ্রামের, সওদাগরা নামক মহল্লায় স্বনামধন্য একটি মুসলিম হানাফি আলেম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তার নাম রাখা হয় মুহম্মদ। তার মাতা তার নাম রাখের আমান মিয়া। পিতা তার নাম রাখেন আহমাদ মিয়া। দাদা তার নাম রাখেন আহমাদ রেজা। তার পিতা নক্বী আলী এবং দাদা রেজা আলী কে হানাফিদের মধ্যে খ্যাত নামা আলেম হিসাবে বিবেচনা করা হত। (তাজকিরাতু উলামায়ে হিন্দ পৃষ্ঠা-৬৪)। তার মাতার নাম ছিল হুসাঈনী খানম।

শিক্ষা: তারপর প্রাথমিক শিক্ষা ও নাহু, সরফ, উর্দু, ফারসীর জ্ঞান অর্জন করেন, তাঁর পিতার ঘনিষ্ঠ বন্ধু মাওলানা গোলাম কাদের বেগ সাহেবের নিকট। তারপর ‘শরহে ছমগীনী’ নামক কিতাব পড়েন মাওলানা আব্দুল আলী রামপুরী সাহেবের নিকট। পিতা নকী আলীর কাছে তিনি প্রচলিত দারসে নিযামী ধারার পাঠ গ্রহণ করে। এরপর মির্জা কাদীয়ানির ছোট ভাই মির্জা কাদের বেগ থেকে দীর্ঘ সাত বৎসর দীনি ইলিম শিক্ষা নেন। তিনি শিক্ষা অর্জনের জন্য কোন মাদরাসায় ভর্তি হননি। (খায়াবানে রেজা-১৮, ইকবাল আহমাদ কাদেরী)।

আলা হযরত নিজেই বলেছেন যে, “আমার কোন উস্তাদ নেই”। (সীরাতে ইমাম আহমাদ রেজা-১২, আব্দুল হাকীম শাহ জাহানপুরী)।

তিনি দৈনিক এক পারা করে মাত্র ত্রিশ দিনে ত্রিশ পারা কিরআন শরিফ হিফজ করা শেষ করেন। এক জায়গায় তিনি বলেন যে, আমি কুরআন শরীফ ধারাবাহিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে মুখস্থ করি আর তা এজন্য যে, ঐ সব আল্লাহর বান্দার কথা (যারা আমার নামের আগে হাফিজ লিখে দেয়) যেন ভূল প্রমানিত না হয়। ( হায়াতে আলা হযরত ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ২০৬ মাকতাবাতুল মদীনা, করাচী)।

 

ইসলামি কাজ কর্ম: ১৮৭৭ সালে জনৈক শাহ আলে রাসূলের নিকট কাদেরিয়া তরীক্বার বায়‘আত নেন ও খেলাফত লাভ করেন এবং ঐ সালেই পিতার সাথে হজ্জব্রত পালনের জন্য মক্কায় গমন করেন। অতঃপর দেশে ফিরে লেখালেখিতে মনোনিবেশ করেন । ১৮৮০ সালের দিকে তিনি তার শিরকী কুফুরী মতবাদ প্রচার করা শুরু করেন।   তিনি নিজেকে অতিশয় রাসূল প্রেমিক প্রমাণের জন্য নামের পূর্বে ‘আব্দুল মুছতফা’ (মুহাম্মাদ মুছতফার দাস)’ উপনাম ব্যবহার করেন। অনুসারীদের কাছে তিনি ‘ইমাম’ ও ‘আ‘লা হযরত’ নামে পরিচিত হন।

গবেষনা ও লেখাঃ তিনি আরবী, উর্দূ, এবং ফারসী ভাষায় বিভিন্ন বিষয়ে অনেক বই লিখেছেন। তার লেখার বিষয়বস্তুতে আইন,  ধর্ম এবং দর্শনসহ বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। তিনি ছিলেন উর্বর লেখক, তার জীবদ্দশায় তিনি ইসলামী আইন-কানুনের উপর অনেক লিখা লিখেছেন। তার লেখা বইয়ের সংখ্যা নিয়ে নানা বকম তথ্য পাওয়া যায়। ব্রেলভীদের কিতার ‘মান হুয়া আহমাদ রেজার’ ২৫ পৃষ্ঠায় তার লেখা কিতাব হাজারের উপর উল্লেখ করা হইয়াছে। আবার হায়াতে আহমাদ রেজার’ ১৩ পৃষ্ঠায়  তার লেখা কিতাব ৬০০ উপর বলা হয়েছে। এভাবে কেউ কেউ ৪০০ বা ৪৪০ বা ৩৫০ বা্ ২০০ বা উল্লেখ করেছেন। তবে আল্লামা ইহসান এলাহী যহীর (রহঃ) বলেন, বই হিসাবে গণ্য হয় এমন বইয়ের সংখ্যা ১০এর অধিক নয়। এবং আল্লামা খালেদ মাহমুদ রহঃ এর কথা মুতাবেক বই হিসাবে গণ্য হয় এমন বইয়ের সংখ্যা ১৫-এর অধিক নয়।

১৯১২ সালে তার প্রথম অনূদিত কুরআনের উর্দূ তরজমা ‘কুনূযূল ঈমান ফি তরজমাতিল কুরআন’ প্রকাশিত হয়। এটি হানাফী মাযহাবের আইনসমুহকে সমর্থন করে এটি ভারত উপমহাদেশের সর্বাধিক পঠিত কোরআনের অনুবাদ গ্রন্থ হিসেবে বিবেচনা করা হত। এটি ইউরোপ ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে যার মধ্যে রয়েছে ইংরেজী, হিন্দি, বাংলা, ডাচ, তুর্কী, সিন্ধি, গুজরাটী এবং পশতু। বাংলা ভাষায় কানযুল ঈমান গ্রন্থটি অনুবাদ করেন এম এ মান্নান। তবে এই “কুনূযূল ঈমান ফি তরজমাতিল কুরআন” প্রকাশিত হওয়ার কিছু দিনের মাথায় কিতাব আরব বিশ্ব প্রত্যাখ্যান করে এবং ২৭ টা আরব দেশে তা ব্যান্ড করে দেওয়া হয়।

তার প্রধান ও সর্ববৃহৎ রচনা হল ‘ফৎওয়া রিযভিয়াহ’ রেযা ফাউন্ডেশন মারকাজুল আউলিয়া লাহোরের তত্ত্বাবধানে এটি ৩০ খন্ডে প্রকাশিত হয়। যার পৃষ্ঠা সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ২১৬৫৬, প্রশ্ন উত্তর ৬৮৪৭ টি, রিসাল মোট ২০৬ টি। অনেকে মনে করে, তেমন ভালো কিছু এই কিতাবে নেই, তবে ফতওয়া বাজীতে ভরপুর। ছাড়া আনবাউল মুছত্বফা, খালিছুল ই‘তিক্বাদ, মারজাউল গায়ব ওয়াল মালফূযাত, মাদায়ে আলা হযরত, হাদায়েকে বখশিস, প্রভৃতি তার শিরক কুফুরী ভরপুর প্রসিদ্ধ রচনা।

 

চরিত্র: আলা হযরতের মেজাজ ছিল খুবই চড়া। (আনওয়ারে রেজা-৩৫৮)। তিনি ছিলেন চিররোগা, পিঠব্যথার রুগী, অত্যধিক রাগী, সুচতুর ও তীক্ষ্ণ মেধার অধিকারী। তার মেজাজ ছিল চড়া। মুফতী মাজহারুল্লাহ ব্রেলবী তার ফাতওয়ায়ে মাজহারিয়্যাতে লিখেন “চড়া মেজাজী আলা হযরত আহমাদ রেজা খান হয়তো এ অশ্লীল কবিতা বাজারী মহিলাদের ব্যাপারে উদ্ধৃত করেছেন। (ফাতওয়া মাজহারিয়্যাহ-৩৯২)।

এ কারণেই লোকেরা তার থেকে বিমুখী হতে শুরু করেছিল। অনেক কাছের বন্ধুরাও তার এ স্বভাবের কারণে তার থেকে দূরে চলে যায়। এদের মাঝে মাওলানা মুহাম্মদ ইয়াসীনও আছে। যিনি মাদরাসায়ে শাআতুল উলুমের প্রধান ছিলেন। যাকে আহমাদ রেজা উস্তাদের মর্যাদা দিতেন। তিনিও তার থেকে আলাদা হয়ে যান। এছাড়াও মাদরাসায়ে মিসবাহুত তাহযীব যেটা তার পিতা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেটাও তার দুর্ব্যবহার ও বদমেজাজী, আত্মগরীমা এবং মুসলমানদের কাফের বলার কারণে তার হাত থেকে ছুটে যেতে ছিল। আর মাদরাসার ষ্টাফরা তার থেকে দূরে সরে ওহাবীদের সাথে মিলে। অবস্থা এমন হয়ে যায় যে, বেরেলবীদের মার্কাজে আহমাদ রেজা খার তত্বাবধানে কোন মাদরাসা বাকি রইল না। (আল্লামা ইহসান এলাহী যহীর, হায়াতে আলা হযরত-২১১)।

আলা হযরত, মাওলানা আব্দুল হক খায়রাবাদীর কাছে মানতেকী ইলম শিখতে চাইলেন। কিন্তু তিনি তাকে পড়াতে রাজি হলেন না। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেনঃ আহমাদ রেজা বিরুদ্ধবাদীদের ব্যাপারে খুবই কঠোর শব্দ ব্যবহার করতে অভ্যাস্ত। (হায়াতে আলা হযরত-২৩, যফরুদ্দীন, আনওয়ারে রেজা-৩৫৭)।

বৃটিশ শ্বাষকদের সমর্থক:  আহমেদ রেজা ব্রেলভী আযাদী আন্দোলনের বিরোধী ছিলেন। শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেওলভীর বিরোধ পক্ষ হিসেবে তিনি আবির্ভূত হন। তৎকালীন মুসলিমগন বৃটিশ শাসিত ভারতকে ‘দারুল হারব’ ঘোষণা দিলে, তিনি তার ঘোর আপত্তি করেন।  তিনি ততৎকালীন বৃটিশ শাসিত ভারতকে দারুল ইসলাম ঘোষণা করেন। জিহাদের বিপক্ষ অবস্থান নেন। এবং এ দেশে জিহাদ ও হিজরতের বিরোধিতা করে ফতওয়া প্রদান করেন। আল্লামা ইহসান এলাহী যহীর “ব্রেলভী মতবাদ” বই-এ উল্লেখ করেন, বৃটিশদের সমর্থনের উদ্দেশ্য আহমদ রেজা খাঁন একটি বই লিখনে। যাতে তিনি ফতওয়া প্রদান করেন যে, ভারতের মুসলিমদের জন্য জিহাদ ফরজ নয়। আর যে ব্যক্তি এর ফরজিয়াতের উপর ঐক্যমত পোষন করে সে মুসলিমদের বিরোধী এবং তাদের ক্ষতি করতে চায়। জিহাদ ও বৃটিশ বরোধিতা হতে মুসলিমদের বিরত রাখার জন্য আহমদ রেজা খাঁন লিখেন, মহান আল্লাহ বলেন,

يَـٰٓأَيُّہَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ عَلَيۡكُمۡ أَنفُسَكُمۡ‌ۖ لَا يَضُرُّكُم مَّن ضَلَّ إِذَا ٱهۡتَدَيۡتُمۡ‌ۚ إِلَى ٱللَّهِ مَرۡجِعُكُمۡ جَمِيعً۬ا فَيُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمۡ تَعۡمَلُونَ (١٠٥)

হে ঈমানদারগণ ! নিজেদের কথা চিন্তা করো, অন্য কারোর গোমরাহীতে তোমাদের কোন ক্ষতি নেই যদি তোমরা নিজেরা সত্য সঠিক পথে থাকো৷ তোমাদের সবাইকে আল্লাহর দিকে ফিরে যেতে হবে৷ তখন তোমরা কি করছিলে তা তিনি তোমাদের জানিয়ে দেবেন৷  (সুরা মায়িদা ৫:১০৫)।

অর্থাৎ প্রত্যেক মুসলিমরে ব্যক্তিগিতভাবে আত্মসংশোধন করা উচিৎ এবং সম্মিলিত জিহাদের কোন প্রয়োজন নেই। এবং যারা বৃটশি বিরোধী নতৃবৃন্দ ও অসহযোগ আন্দোলন সমর্থ করে তাদের সকলের উপর কুফর ফতওয়া জারি করেন। (ব্রেলভী মতবাদ পৃষ্ঠা -৫৭)।

তিনি ইংরেজদের পৃষ্ঠপোষকতায় একদিকে ভ্রান্ত আকীদা প্রচার ও নানা প্রকার শরীয়ত বিরোধী কাজ চালু করে শিরক ও বেদায়াতের পথ উন্মুক্ত করেন এবং অন্যদিকে ইংরেজদের বিরুদ্ধে জিহাদরত ওলামায়ে কেরামগণকে ওহাবী বলে প্রচার চালায়। সেই সময়ের ৩ শতাধিক মুফাসসির,মুহাদ্দিস,মুজাদ্দিদ,মুজাহিদ এবং সংস্কারক বলে বিবেচিত আলেমদেরকে তিনি কাফির বলে ফতোয়া

 

তার বিরোধী কারা: তার ভাষায়, দেওবন্দী ও ওহাবীরা  রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে যথাযথ সম্মান না দেয়ায় তিনি তাদের তীব্র সমালোচনা ও তিরস্কার করেছেন। কাফের মুশরিক হওয়ার অসংখ্য ফতওয়া ও প্রদান করেন। তার সাথে কিছু  কিতাব ও রচনা করে। কবর মাজার বা বিদাতে বিরুদ্ধে কিছু বললেই, তার অনুসারিদের প্রায়ই দেওবন্দী, জামাতি, তাবলীগি ও ওহাবী বলে গাল মন্দ করতে দেখা যায়।  অন্যদিকে তিনি অবশ্য ক্বাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণার দাবীতে তৎপরতা চালান। তবে অনেকে মনে করে, তা ছিল লোক দেখানোর জন্য।  কারন ভিতরগত ভাবে তার সুসম্পর্ক ছিল কাদিয়ানী পরিবারের সাথে। (আল্লাহু আলাম)। তা যাহোক তিনি কাদিয়ানি বিরোধী ছিলেন এটা প্রমানিত।দেন।

আহমাদ রেজা খাঁ বেরেলভী ১৩২৩ হি: হজ্বের উদ্দেশ্যে সফর করে। হজ্ব শেষে তিনি মক্কা শরীফে একটি পুস্তক রচনা করলেন। দেওবন্দ অনুসারি আলেমদের দাবি অনুসারে, এই পুস্তকে তিনি বেশ কয়েকজন বরেণ্য উলামায়ে দেওবন্দের বক্তব্যকে শাব্দিক ও অর্থগতভাবে বিকৃত করে উপস্থাপন করে। এবং দেওবন্দের উলামায়ে কেরামের ব্যাপারে কিছু অপবাদ আরোপ করে। এ পুস্তকে সে দেওবন্দের বড় বড় আলেমকে কাযযাবী দল, শয়তানী দল হিসাব উল্লেখ করেছেন। এবং সে দেওবন্দী আলেম মাওলানা কাসেম নানুতুবী (রহ.), মাওলানা রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী (রহ.), হযরত মাওলানা খলীল আহমাদ সাহারানপুরী (রহ.) ও আশরাফ আলী থানবী (রহ.) এর বক্তব্যকে বিভিন্নভাবে উপস্থান করে তাদের সবাইকে সুনিশ্চিত কাফের ফতোয়া দিয়েছে এবং এও লিখেছে যে, যারা তাদেরকে কাফের মনে করবে না, তারাও কাফের। আহম্মদ রেজা খান দেওবন্দী কিছু আমেদের লেখা বই উপস্থাপন করে। তাদের বিভিন্ন বইয়ের উদৃতিও উপস্থাপন করেন। বিভিন্ন পদ্ধতি তিনি মক্বা-মদীনার আলেমগণের সাক্ষ্য গ্রহণের চেষ্টা করতে থাকে। কিন্তু মক্কা-মদীনার উলামায়ে কেরামের নিকট উলামায়ে দেওবন্দের আক্কিদা-বিশ্বাস্ ও তাদের লিখনী পরিচিত না থাকায়, অনেকেই সেখানে ফতোয়া দেয়ার সময় বলেন যে, যদি বাস্তবেই তাদের আক্বিদা এমন হয়ে থাকে, তবে তারা কাফের হবে। হজ্জ থেকে ফিরে কিছুদিন চুপ-চাপ থেকে ১৩২৫ হি: আহমাদ রেজা খাঁ উক্ত পুস্তিকাটি ‘হুসসামুল হারামাইন’ নামে প্রকাশ করে। এবং প্রচার করে যে, মক্কা-মদীনার উলামায়ে কেরামের নিকট উলামায়ে দেওবন্দ কাফির।

বিরোধী চোখে: তার বিরোধীরা মনে করেন, তিনি শিয়া ছিলেন এবং ‘তাকিয়া’ করতেন। এবং তার পুরা জীবনে এ সত্য প্রকাশ করেনি যাতে সে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাত এর মাঝে বসবাস করতে পারে। এবং শিয়া আকিদা প্রাচার করতে পারে। প্রমান হিসাবে তার বিরোধীরা বলে,

ক. তিনি শিয়াদের মত পাস পাঞ্জাতন বিশ্বাস করতেন, তিনি তার ফতয়ায়ে রিজভিয়্যার ৬ষ্ঠ খন্ডের ১৮৭ পৃষ্ঠায় লিখেন, এমন পাঁচজন ব্যক্তি আছে যাদেন বরকতে সকল দুঃখ কষ্ট দুল করে দেয়। (তারা হলেন) মুহম্মদ, আলী, হাসান, হোসেন ও ফাতিমা। (শিয়াদের এই পাঞ্জাতন সম্পর্কে যা কিছু বলা হয় সবই জাল: হাদিসের নামে জালিয়াতি; ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গির)।

খ. তার বাবা দাদা ও পূর্ব পুরুষদের নামের সাথে শিয়াদের মাঝে পাওয়া নামের সাথে মিলে যায়। যেমন তার পূর্ন নাম হল: আহম্মদ রেজা বিন নকী আলী বিন রেজা আলি বিন কাজিম আলী।

গ. তার অনেক হাদিসে এমন শিয়া বর্ণনা কারি আছে যার সাথে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতেন কোন সম্পর্ক নেই (শিয়া বর্ণনা কারি)। যেমন: আলী কিয়ামতের দিবসর জাহান্নাম বিতরন করবেন। (আলমান ওয়াল আলী, আহমদ রেজ ব্রেলভী)।

ঘ. শিয়াদের একটা বিপদ দুর করার দোয়া প্রশিদ্ধ, যার নাম হল “সাইফি দোয়া”। যেখানে আলী কে বিপদ দুরকারি বলে ঘোষন করা হয়েছে। আহমদ রেজা খান বলেন, যে “সাইফি দোয়া” দ্বারা দোয়া করবে তার বিপদ দূর হয়ে যাবে।

ঙ. আহমদ রেজা খান তার “খতমে নবুয়াত” এর ৯৭ পৃষ্ঠায় লিখেন, ফাতিমা (বাদি:) এর নাম রাখা হয়েছিল কারন আল্লাহ তাকে এবং তার বংশধরদের আগুন হতে রক্ষা করছেন।

এভাবে অনেক লেখায় তার শিয়াদের প্রতি দুর্বলাতা খুজে পাওয়া যায়, তাই অনেকে তাকে শিয়া বলতে দিধা করেনি। (আল্লাহতায়ালাই ভাল জানেন, হে আল্লাহ আমদের ক্ষমা করুন)।

চ. তার অনুসারিরা শী‘আদের মত মনে করে যে, ওলীরা মা‘ছূম। তাদের কোন পাপ নেই। তাই শী‘আদের ইমামদের মত তারাও তাদের আওলিয়াদের মাযার তৈরী করে। মাযারে মোমবাতি বা আলোকসজ্জা করে, কবরের উপর ফুল, নকশাদার চাদর ইত্যাদি চড়ায়। তাদের কবরকে ঘিরে তাওয়াফ করে। তারা মনে করে, আওলিয়াদের নযর-নেয়ায দেয়া এবং তাদের কাছে প্রার্থনা করা জায়েয। এমনিভাবে জানাযার ছালাতের পর হাত তুলে দো‘আ করা, ফাতেহা পাঠ করা, তীজা, চল্লিশা ও বার্ষিক ঈছালে ছাওয়াবের অনুষ্ঠান ও উৎকৃষ্ট ভোজের ব্যবস্থা করত: কুরআন খতম করা, কবরের পার্শ্বে আযান দেওয়া, মৃতের কাফনের উপরে কালেমা তাইয়েবা লেখা, শায়খ আব্দুল কাদির জিলানীর স্বরণে ফাতিহা-ইয়াযদাহমের অনুষ্ঠান করা এবং আওলিয়াদের নামে পশু পালন ইত্যাদি শিরকী-বিদ‘আতী কাজকে তারা পরম ছওয়াবের কাজ মনে করে।

ছ. হযরত আলী (রাঃ) এর মধ্যে খোদায়ী বৈশিষ্ট ছিল।

মাওলানা আহমদ রেযা খান লিখেছেন, বে সক আলি কা নাম নামে আল্লাহ বাতেঁ আপকি কালামুল্লাহ
অর্থাৎ আলীর নামটাই হল আল্লাহর নাম এবং তাঁর কথা হল কালামুল্লাহ বা আল্লাহর কালাম । (নাউজুবিল্লাহি মিন যালিক। (নাতে মাকবুলে খোদা, পৃষ্ঠা-৮২)

 

 

সমর্থদের চোখে: আ’লা হযরত এটি একটি প্রতিষ্ঠানের নাম। একটি মানুষ যখন একাধিক কাজের কাজী হয়ে যান ও জাতি তাকে হরেক রকম কাজের মানুষ হিসাবে জানে, তখন তিনি আর একটি ব্যক্তির ফ্রেমে আবদ্ধ থাকেন না, তখন আবদুর রহমান সাহেব হয়ে যান ‘রহমান গ্রুফ অব কোম্পানী’ তথা তিনি তখন একটি প্রতিষ্ঠান। আ’লা হযরত কি না ছিলেন? মা-বাবার কলিজার ধন, ছেলে-মেয়ের আদর্শ পিতা, একজন উচ্চমাপের জ্ঞানী, সমাজপতি, আলেম, লেখক, সু-বক্তা, মোনাজির, মুফতি, হাফেজ, শিক্ষক, পীর, কবি, সাহিত্যিক, দানশীল, কর্মঠ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, গণিতবিদ, তাসাউফবিদ, সমাজ সংস্কারক, হাজ্বী, গাজী, কাজীসহ অসংখ্য গুণবাচক শব্দ উনার শানে ব্যবহারের যুক্তিযুক্ত কারণ রয়েছে। উনি কোন বিষয়ে লেখার বাকি রেখেছেন? পবিত্র কোরআনের তাফসীর, হাদিসের ব্যাখ্যা, ইলমে ফিকহ, ইলমুল কালাম, ইতিহাস, মানাকিব, সিয়ার ও ফালসাফাসহ ৫৫টি বিষয়ের উপর।

তার সমর্থক কর্তৃক বিবৃত তার কিছু কিরামত:

১। ব্রেলভিদের মতে, তিনি যখন দ্বিতীয় বার হজ্জ করতে যান, তখন মদিনা ‍গিয়েছিলেন। মদিনা শরীফে তিনি

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামে দিদার লাভের আশায় দীর্ঘক্ষন যাবৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামে রওজা মোবারকের সামনে সালাত ওসালাম পাঠ করতে থাকেন। কিন্তু প্রথম রাতে  দিদার লাভ সৌভাগ্য  ছিল না। তাই তিনি সেখানে বসে প্রশংসামুলক গজল লিখেছিলেন। তিনি শেষ চরনে লিখেন,” হে আহমদ রজা! আর তোমার বাস্তবায়ন কি? তোমার মত হাজার হাজার মদীনার কুকুর গলী সমুহে এদিক সেদিক ঘুরাফেরা করছে””। এই গজল আরজ করার পর তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামে দিদার লাভের আশায় আদবের সাথে বসে রইলেন। হটাৎ তার ভাগ্য প্রসন্ন হইল এবং জাগ্রত অবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দর্শন লাভের সৌভাগ্য হল। (হায়াতে আলা হযরত ১ম খন্ড পৃষ্ঠা -৯২)।

 

২। তার জীবনে অসংখ্য কারামত রয়েছে। একদিন তিনি রেলযোগে ‘ফিলিবেত’ থেকে বেরলভী যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে নওয়াবগঞ্জ ষ্টেশনে দুই এক মিনিটের জন্য রেল থামল। তখন মাগরীবের নামাজের সময় হয়েছে। তিনি তার সঙ্গীদের নিয়ে নামাজ আদায়ের জন্য প্লাটফর্মে গিয়ে নামাজে দাঁড়িয়ে গেলেন। ইতিমধ্যে চালক ইঞ্জিন চালু করলেন, কিন্তু রেল সামনে যাচ্ছিল না। প্রাণপণ চেষ্টা করেও চালক সম্মুখের দিকে রেল অগ্রসর করতে পারল না। ততক্ষণে ষ্টেশনের টিটিসহ সবাই জড়ো হয়ে গেল। অবাক কান্ড আলা হযরত (রহঃ) নামাজ শেষ করে রেলে সঙ্গী সাথীদেরকে নিয়ে উঠতেই রেল চলতে শুরু করে দিল।

এভাবে অসংখ্য কিরামতির কথা তার সমর্থগন প্রচার করে থাকেন।

 

শেষ মুহুর্ত: আলা হযরত তার ইন্তেকালের চার মাস বাইশ দিন পূর্বে, পবিত্র কুরআনের ২৯ পারার সূরা দাহরের ১৫ নং আয়াত থেকে তার ইন্তিকালের বছর বের করেন। সে আয়াতটি ‘ইলমে আবজদ’ অনুসারে সংখ্যা হয় ১৩৪০। আর এটাই হিজরি সাল মোতাবেক ইন্তিকালেন সাল এই আয়াতটি হল :

وَيُطَافُ عَلَيۡہِم بِـَٔانِيَةٍ۬ مِّن فِضَّةٍ۬ وَأَكۡوَابٍ۬ كَانَتۡ قَوَارِيرَا۟ (١٥)

তার কানযুল ঈমান থেকে অনুবাদ: তার সামনে রৌপ্য পাত্র সমৃহ ও পান পাত্রদি পরিবেশনের জন্য ঘুরান ফিরান হবে। (সুরা দাহর ৭৬:১৫)। (সওয়ানেহে ইমাম আহমদ রযা পৃষ্ঠা ৩৮৪)।

তাঁর মৃত্যুর ২ ঘন্টা ১৭ মিনিট পুর্বে তিনি একটি অসিয়ত লিখে যান । তাতে তিনি নির্দেশ দেন,
“রেযা হুসাইন হাসনাইন আউর তুম মুহাম্মাদ ও ইত্তেফাক সে রহো আউর হাত্তা লা মাকান ইত্তিবায়ে শরীয়াত না ছোড়ো আউর মেরে দ্বীন ও মাযহাব জো মেরে কুতুব সে জাহির হ্যায় উস পর মযবুতি সে কায়েম রহনা হর ফরয সে আহম ফরয হ্যায় ।” (অসায়া শরীফ, পৃষ্ঠা-১০, অসিয়ত নং ১৪)

বহু আলোচিত সমালোচি গ্রন্থ রচনাকারী আহমদ রেজা খান ২৫ সফর ১৩৪০ হিজরি মোতাবেক ২৮ অক্টোবর ১৯২১ খ্রি. জুমারদিন ধরাধাম ত্যাগ করেন।

 

ব্রেলভীদের আকিদা বিশ্বাস

******শির্কি বিশ্বাস সমূহ

 

০১। আল্লাহতায়ালা কে সর্বত্র বিরাজমান মনে করা।

০২। আল্লাহতায়ালা কে নিরাকার মনে করা।

০৩। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহতায়ালার মতই অদৃশ্যর জ্ঞান রাখেন।

০৪। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহতায়ালার মতই হাজির ও নাজির।

০৫। একটা পর্যায় দুনিয়াতে বসেই আল্লাহকে দেখা সম্ভব বলে বিশ্বাস করে।

০৬।  অহেদাতুল অজুদে  বা সর্বেঈশ্বরবাদে বিশ্বাসি, করে। {তাদের দৃষ্টিতে পৃথিবীতে অস্তিত্ববান সব কিছুই আল্লাহর অংশ। আল্লাহ পৃথক কোন সত্তার নাম নয়।(নাঊযুবিল্লাহ)।
০৭। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নুরের তৈরি।

০৮। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মতই কবরে জীবিত আছেন।

০৯। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহতায়ালার মত মানুষের ভাল মন্দ করার ক্ষমতা রাখেন।

১০। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহতায়ালার সাথে তুলনা করে ও কোন কোন ক্ষেত্রে আল্লাহর সমান জ্ঞান করেল ।

১১। গাউস, কুতুব, আবদাল, নকিব ইত্যাদিতে বিশ্বাসি। (এদের ‌নিজেস্ব ক্ষমতা আছে বিশ্বাস করা)।

১২। বিপদে পীর বা অলি আওলিয়াদের আহবান করে এবং তাদের কবরের নিকট গিয়ে কোন কিছু চাওয়া, এবং তারা বিপদ হতে উদ্ধার করতে পারেন।

১৪। অলি আওলিয়ারা কবরে কাছ ফরিয়াদ করলে শুনতে পান।

১৫।  কবরে সিজদাহ করে।

১৬। মিলাদ মাহফিল চলা কালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনে বিশ্বাস করা। (এ  উপলক্ষে মিলাদ মাহফিলের মাঝে কিয়াম করে বা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনের কামনায় চেয়ারের ব্যবস্থা করা)।

১৭।মাধ্যম ছাড়া আল্লাহ পর্যান্ত পৌছান যায় না।

১৮। অলিদের কাশফ কে তাদের নিজস্ব ক্ষমতা মনে করে।

১৯। অলি আওলিয়াদের কিরামত ইচ্ছাধীন মনে করা।

২০। তাবিজ কবজে বিশ্বাসি

 

*********বিদআতি বিশ্বাস সমূহ

০১। কবর জিয়ারত ওয়াজিব মনে করা।

০২। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বপনের মতই জীবিত অবস্থায় দেখা যায়,

০৩। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম না হলে পৃথিবী সৃষ্টি হত না,

০৪। অলি আওলিয়াদের স্মৃতি বিজড়িত স্থান থেকে বরকত লাভ করা যায় বলে বিশ্বাস করা। ( অবশ্য হাদিসে বর্ণিত স্থান থেকে বরকত লাভ করা যায়)।

০৫। তাক্কলিদে শাকসিতে বিশ্বাসি বা যে কোন এক মাজহাব মানা ওয়াজিব বলে বিশ্বাস করা।

০৬।  পীর বা অলীদের কলবের তাওয়াজ্জু দানে বা নেক নজরে বিশ্বাসি।

০৭। এলম সিনা থেকে সিনার মধ্যমে চলে আসছে।

০৮। সংশোধনের জন্য পীর ধরা ওয়াজিব মনে করে।

০৯। পীর ও অলি আওলিয়াদের ছাড়া এছলা সংশোধন হয় না

১০। বিভিন্ন দিবসে মৃত্যু ব্যক্তি ফিরে আসে এই বিশ্বাস রেখে ঐ দিনে হালুয়া রুটি রেখে দেওয়া।

১১।

 

*********বিদআতি আমল সমূহ

০১। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কল্পিত জ্ম্ম দিন কে সব ঈদের শ্রেষ্ঠ ঈদ (ঈদে মিলাদুন নব্বী)  হিসবে পালন করে।

০২। ইবাদাত মনে করে কবরের নিকট মিলাদ পড়ে, ফাতিহা আদায় করে ও ওরস পালন করে।

০৩। কবর পাকা করে, কবরের উপর গম্বুজ নির্মান করে।

০৪। কবর চাদর চড়ায়, মুমবাতি ও আগর বাতি জ্বালায়।

০৫।  মাজারে মান্নত করে, টাকা পয়সা দান করন, সিন্নি দেয়, তরিতরকারি দান করে, ফলমুল দান করে ইত্যাদি।

০৬। মাজারে গরু, মহিষ, উট, ভেড়া, ছাগল ইত্যাদি জবেহ করে।

০৭। মৃত্যুকে কেন্দ্র করে কুলখানি, চল্লিসা আদায় করা।

০৮। বিভিন্ন বৃদ্ধাঙ্গুলী চুম্বন করে খতম আদায় করে

০৯। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের  নাম শুনলে বৃদ্ধাঙ্গুলী চুম্বন করে।

১০। অলি আওলিয়াদের কবরের নিকট বরকতের জন্য দোয়া করা।

১১। দোয়ায় মৃত নবী, পীর ও অলি আওলিয়াদের অছিলা দিয়ে দোয়া করে।

১২। স্বন্পকে শরিয়তের দলিল মনে করেনা কিন্তু প্রমান হিসাবে ব্যবহার করে।

১৩। পীর বা শায়েকের ধ্যান করে।

১৪। এছলা সংশোধন জন্য যে কোন একটা তরিকা ধরতে হবে।

 

এই শির্কি আকিদাগুলির মধ্যো এক থেকে আট পর্যান্ত এই গ্রন্থের প্রথম পর্যায়ে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। তাই তাদের পরবর্তি আকিদাগুলির অসারতা প্রমানের চেষ্টা করব। (ইনশা আল্লাহ)। তারা কি সত্যই এই সব ভ্রান্ত আকিদা প্রসন করে। তাহলে এর রেফারেন্স কোথায়? এ সত্যতা কোথায় খুজব? তাদের এ ভ্রান্ত ও শির্কি আকিদাগুলি প্রমানের জন্য তাদের কোন বইয়ের রেফারেন্স দেওয়ার দরকার নেই। কারন তারা এই আকিদাগুলি স্বীকার করে ও প্রচার করে। এই ভ্রান্তি আকিদা প্রমানের জন্য বিভিন্ন ওয়েব সাইড থেকে ঢালাও ভাবে প্রচার চালাচ্ছে। শত শত কিতাব রচনা করছে। তার পরোও যদি কোন সত্য সন্ধানী ভাই সত্যতা যাচাই করতে চান তবে শায়খ ইহসান ইলাহী যহীর (রহ) এর লেখা “ বেরেলভী মতবাদ:আকিদা-বিশ্বাস ও ইতিহাস” গন্থখানা পড়লেই সব রেফারেন্স এক সাথে পেয়ে যাবেন। দেখবেন এরাই প্রথম কুরআন হাদিদের অপব্যাখ্যা করে প্রমান করেছে, মৃত আওলীয়াদের নিকট সাহায্য চাওয়া জায়েয। বইটি যেহেতু বিভিন্ন ভ্রান্ত আকিদা চিহিৃত করার জন্য লেখা তাই ব্রেলভীদের “বিদআতি আমল সমূহ” এবং “বিদআতি বিশ্বাস সমূহ” নিয়ে আলোচনা করব না। শুধু ভ্রান্ত আকিদাসমুহ আলোচনায় নিয়ে আসব।

 

৯.  রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহতায়ালার মত মানুষের ভাল মন্দ করার ক্ষমতা রাখেন।

তাদের বিশ্বাস মতে, রাসূল (ছাঃ) এমন ক্ষমতার অধিকারী, তিনি সারা দুনিয়া পরিচালনা করে থাকেন। তাদের একজন বড় নেতা আমজাদ আলী ব্রেলভী বলেছেন, ‘রাসূল (ছাঃ) হলেন আল্লাহর সরাসরি নায়েব (প্রতিনিধি)। সমস্ত বিশ্বজগৎ তাঁর পরিচালনার অধীন। তিনি যা খুশী করতে পারেন এবং যাকে খুশী দান করতে পারেন। যাকে খুশী নিঃস্বও করতে পারেন। তাঁর রাজত্বে হস্তক্ষেপ করা দুনিয়ার কারু পক্ষে সম্ভব নয়। যে তাঁকে অধিপতি হিসাবে মনে করে না, সে সুন্নাত অনুসরণের স্বাদ থেকে বঞ্চিত হয়েছে’।

এখনে আমি কুরআনের একটা আয়াত তুলে ধরছি যেখানে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ঠ ভাষায় বলছেন মুহম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন অবস্থায়ই নিজের জন্য লাভ -ক্ষতির কোন ইখতিয়ার রাখে না।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

قُل لَّآ أَمۡلِكُ لِنَفۡسِى نَفۡعً۬ا وَلَا ضَرًّا إِلَّا مَا شَآءَ ٱللَّهُ‌ۚ وَلَوۡ كُنتُ أَعۡلَمُ ٱلۡغَيۡبَ لَٱسۡتَڪۡثَرۡتُ مِنَ ٱلۡخَيۡرِ وَمَا مَسَّنِىَ ٱلسُّوٓءُ‌ۚ إِنۡ أَنَا۟ إِلَّا نَذِيرٌ۬ وَبَشِيرٌ۬ لِّقَوۡمٍ۬ يُؤۡمِنُونَ (١٨٨)

অর্থ: হে মুহাম্মাদ ! তাদেরকে বলো, নিজের জন্য লাভ -ক্ষতির কোন ইখতিয়ার আমার নেই৷ একমাত্র আল্লাহই যা কিছু চান তাই হয়৷ আর যদি আমি গায়েবের খবর জানতাম, তাহলে নিজের জন্যে অনেক ফায়দা হাসিল করতে পারতাম এবং কখনো আমার কোন ক্ষতি হতো না৷   আমিতো নিছক একজন সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা আমি গায়েবের খবর জানতাম, তাহলে নিজের জন্যে অনেক ফায়দা হাসিল করতে পারতাম এবং কখনো আমার কোন ক্ষতি হতো না৷   এমন জাতীর জন্য, যারা বিশ্বাস করে।৷  [আরাফ ৭: ১৮৮]

এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা তার রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পরিস্কার ভাবে ঘোষনা দিতে বললেন যে, মুহাম্মদ (স:) নিজের কোন লাভ -ক্ষতির করতে পারে না। অথচ এই কুরআন বিরোধী আকিদা রাখে সুন্নী নামের ভন্ডরা।

 

১০। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহতায়ালার সাথে তুলনা করে ও কোন কোন ক্ষেত্রে  সমান জ্ঞান করেল।

আহমাদ রেযা খান ভক্তির আতিশয্যে গদগদ চিত্তে লিখেছেন, ‘হে মুহাম্মাদ (ছাঃ)! আমি আপনাকে আল্লাহ বলতে পারছি না। কিন্তু আল্লাহ ও আপনার মাঝে কোন পার্থক্যও করতে পারছি না। তাই আপনার ব্যাপারটি আমি আল্লাহর হাতেই ছেড়ে দিলাম, তিনিই আপনার ব্যাপারে সবিশেষ অবগত’ (হাদায়েক বখশিশ, ২/১০৪)।

মহবন ্মমহ

মহান আল্লাহর একটা গুন হল তিনি সব কিছু দেখেন ও শুনেন, তাই তিনিই সর্বত্র হাজির ও নাজির। এটা মহান আল্লাহর একক গুন। এ গুনটা অন্য করো জন্য কল্পনা করাও শির্ক। অথচ এই গুনটিতে মহান আল্লাহর সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে শরিক করে।

যা বাংলাদেশের আকবার আলী রিজভী ও তার কিতাবে লিখেছেন। যে আল্লাহ্‌ এবং রাসুল উল্লাহ সঃ আলাদা কিছু নয় আল্লাহ্‌ এবং রাসুলুল্লাহ দুটিই একি সত্ত্বা। (নাউজুবিল্লাহ)। ফলে এ আক্বীদার ভিত্তিতে আজকাল মসজিদে, বাসে, রিকশায় সর্বত্র ‘আল্লাহ’ ও ‘মুহাম্মাদ’ পাশাপাশি লেখার ছড়াছড়ি লক্ষ্য করা যায়।

অথচ  সূরা কাহাফে মহান আল্লাহ এরশাদ করেনঃ

قُلۡ إِنَّمَآ أَنَا۟ بَشَرٌ۬ مِّثۡلُكُمۡ يُوحَىٰٓ إِلَىَّ أَنَّمَآ إِلَـٰهُكُمۡ إِلَـٰهٌ۬ وَٲحِدٌ۬‌ۖ فَمَن كَانَ يَرۡجُواْ لِقَآءَ رَبِّهِۦ فَلۡيَعۡمَلۡ عَمَلاً۬ صَـٰلِحً۬ا وَلَا يُشۡرِكۡ بِعِبَادَةِ رَبِّهِۦۤ أَحَدَۢا (١١٠)

অর্থ: (হে রাসূল!) ‘আপনি বলে দিন, আমি তো তোমাদেরই মত এক জন মানুষ, আমার নিকট এই মর্মে ওহী করা হয় যে, তোমাদের উপাস্য এক ও একক, অতএব যে নিজ প্রতিপালকের দিদার লাভের আশাবাদী সে যেন সৎকর্ম করে এবং নিজ প্রতিপালকের ইবাদতে অন্য কাউকে শরীক না করে’। [সূরা আল্ কাহাব- ১৮:১১০]

 

১১। গাউস, কুতুব, আবদাল, নকিব ইত্যাদিতে বিশ্বাসি। (এদের ‌নিজেস্ব ক্ষমতা আছে বিশ্বাস করা)।

 

ক.  তাদের মতে, রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে ওলী-আওলিয়ারাও দুনিয়া পরিচালনার কাজে সম্পৃক্ত রয়েছেন। আহমাদ রেযা খান লিখেছেন, ‘ হে গাওছ (আব্দুল কাদের জিলানী)! ‘কুন’-বলার ক্ষমতা লাভ করেছেন মুহাম্মাদ (ছাঃ) তাঁর প্রভুর কাছ থেকে, আর আপনি লাভ করেছেন মুহাম্মাদ (ছাঃ) থেকে। আপনার কাছ থেকে যা-ই প্রকাশিত হয়েছে তা-ই দুনিয়া পরিচালনায় আপনার ক্ষমতা প্রমাণ করেছে। পর্দার আড়াল থেকে আপনিই আসল কারিগর।’

খ. তারা বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ যেহেতু একা, সেহেতু একাই তাঁর পক্ষে পুরো বিশ্বজগত পরিচালনা করা সম্ভব নয়। ফলে তিনি তাঁর বিশ্ব পরিচালনার সুবিধার্থে আরশে মু‘আল্লায় একটি পার্লামেন্ট কায়েম করেছেন। সেই পার্লামেন্টের সদস্য সংখ্যা মোট ৪৪১ জন। আল্লাহ তাদের স্ব স্ব কাজ বুঝিয়ে দিয়েছেন। তন্মধ্যে নাজীব ৩১৯ জন, নাক্বীব ৭০ জন, আবদাল ৪০ জন, আওতাদ ৭ জন, কুতুব ৫ জন এবং একজন হ’লেন গাওছুল আযম, যিনি মক্কায় থাকেন। উম্মতের মধ্যে আবদাল ৪০ জন আল্লাহ তা‘আলার মধ্যস্থতায় পৃথিবীবাসীর বিপদাপদ দূরীভূত করে থাকেন। তারা অলীগণের দ্বারা সৃষ্টজীবের হায়াত, রুযী, বৃষ্টি, বৃক্ষ জন্মানো ও মুছীবত বিদূরণের কাজ সম্পাদন করেন।

তাদের েএই আকিদা কুফরি আকদিা কারন বিশ্বজগত পরিচালনার জন্য আল্লাহর কারো নিকট থেকে সাহায্য নিতে হয় না।তিনি আরও বলেন,

(يُدَبِّرُ الْأَمْرَ مِنَ السَّمَاءِ إِلَى الْأَرْضِ)

তিনি আকাশ থেকে পৃথিবী পর্যন্ত সমস্ত কর্ম পরিচালনা করেন। (সূরা সাজদা :৫)।

মহবন আল্লাহ আকাশ থেকে পৃথিবী পর্যন্ত সমস্ত কর্ম পরিচালনা করেন। তিনিই সকলের একমাত্র ত্রান কর্তা। অথচ ব্রেলভীগন আব্দুল কাদের জিলানী (রঃ)কে মহা ত্রাণকর্তা হিসেবে বিশ্বাস করেন। তার নাম রেখেছেন গাউছুল আযম। আল-গাউছুল আল-আযাম অর্থ হচ্ছে মহান ত্রাণকর্তা। তাদের বিভিন্ন আলেমদরে মুখে আব্দুল কাদের জিলানী এমন সব আজগুবি গল্প শুনা যায় মনে হয় তিনি আসলে ত্রানকর্তা। যেমন অনেকে বিশ্বাস করে, বড় পীর আব্দুল কাদের জিলানী নিজ হাতে লাওহে মাহফুযে নতুন করে বৃদ্ধি করতে বা তা থেকে কিছু কমানোরও অধিকার রাখেন। (নাউযুবিল্লাহ)

অথচ রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে মক্কার মুশরিকরাও বিশ্বাস করত দুনিয়া পরিচালনার কাজে আল্লাহ তায়ালার ছাড়া কেউ সম্পৃক্ত নেই।

আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন:

قُلْ مَن يَرْزُقُكُم مِّنَ السَّمَاءِ وَالأَرْضِ أَمَّن يَمْلِكُ السَّمْعَ والأَبْصَارَ وَمَن يُخْرِجُ الْحَيَّ مِنَ الْمَيِّتِ وَيُخْرِجُ الْمَيَّتَ مِنَ الْحَيِّ وَمَن يُدَبِّرُ الأَمْرَ فَسَيَقُولُونَ اللّهُ فَقُلْ أَفَلاَ تَتَّقُونَ

অর্থ: তাদেরকে জিজ্ঞেস করো, “কে তোমাদের আকাশ ও পৃথিবী থেকে রিযিক দেয়? এই শুনার ও দেখার শক্তি কার কর্তৃত্বে আছে ? কে প্রাণহীন থেকে সজীবকে এবং সজীব থেকে প্রাণহীনকে বের করে? কে চালাচ্ছে এই বিশ্ব ব্যবস্থাপনা”?তারা নিশ্চয়ই বলবে, আল্লাহ৷ বলো, তবুও কি তোমরা (সত্যের বিরোধী পথে চলার ব্যাপারে৷)সতর্ক হচ্ছো না?   (সুরা ইউনুস ৩১)।

ব্রেলভী বিশ্বাস মতে, বিশ্বজগত পরিচালনা জন্য আল্লাহ তা‘আলা নাজীব, নাক্বীব, আবদাল, আওতাদ, কুতুব ও গাওছুলদের মধ্যস্থতায় পৃথিবীবাসীর বিপদাপদ দূরীভূত করে থাকেন। এবং তারা অলীগণের দ্বারা সৃষ্টজীবের হায়াত, রুযী, বৃষ্টি, বৃক্ষ জন্মানো ও মুছীবত বিদূরণের কাজ সম্পাদন করেন। অথচ তাদের কল্পিত বিশ্বজগত পরিচালনা কারিগন, বিপদ দুরকারিগন নিজেরাই নিজেদের রবের নৈকট্যলাভের উপায় খুঁজে বেড়াচ্ছে।

যেমন, আল্লাহ তাআলা বলেন:

أُوْلَـٰٓٮِٕكَ ٱلَّذِينَ يَدۡعُونَ يَبۡتَغُونَ إِلَىٰ رَبِّهِمُ ٱلۡوَسِيلَةَ أَيُّہُمۡ أَقۡرَبُ وَيَرۡجُونَ رَحۡمَتَهُ ۥ وَيَخَافُونَ عَذَابَهُ ۥۤ‌ۚ إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ كَانَ مَحۡذُورً۬ا (٥٧)

অর্থ: এরা যাদেরকে ডাকে তারা তো নিজেরাই নিজেদের রবের নৈকট্যলাভের উপায় খুঁজে বেড়াচ্ছে যে, কে তাঁর নিকটতর হয়ে যাবে এবং এরা তাঁর রহমতের প্রত্যাশী এবং তাঁর শাস্তির ভয়ে ভীত। আসলে তোমার রবের শাস্তি ভয় করার মতো৷ (সুরা বনী ইসরাঈল ১৭:৫৭)।

১১। বিপদে পীর বা অলি আওলিয়াদের আহবান করে এবং তাদের কবরের নিকট গিয়ে কোন কিছু চাওয়া, তারা বিপদ হতে উদ্ধার করতে পারেন এবং তাদের কাছ ফরিয়াদ করলে শুনতে পান।

নিজের অভাব পূরণের উদ্দেশ্যে আল্লাহ ছাড়া অন্যকে সাহায্যের জন্য আহবান করা অথচ আল্লহ ছাড়া ঐ বিপদ থেকে কেউ উদ্ধার করতে পরেনা। ঈমানের দাবি হল বিপদ বা সংকটমুক্ত এবং অভাব বা প্রয়োজন পূর্ণ  করার সব ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর হাতেই নিহীত আছে। তাই একমাত্র তার কাছেই প্রর্থনা করা সঠিক ও যথার্থ সত্য বলে বিবেচিত। অন্যকে অভাব পূরণের উদ্দেশ্যে সাহায্যের জন্য আহবান করা পরিস্কার শির্ক।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَأَنَّ ٱلۡمَسَـٰجِدَ لِلَّهِ فَلَا تَدۡعُواْ مَعَ ٱللَّهِ أَحَدً۬ا (١٨)

অর্থ: আর মসজিদসমূহ আল্লাহর জন্য৷ তাই তোমরা আল্লাহর সাথে আর কাউকে আহবান করিও না।(সূরা জিন ৭২:১৮)।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

لَهُ ۥ دَعۡوَةُ ٱلۡحَقِّ‌ۖ وَٱلَّذِينَ يَدۡعُونَ مِن دُونِهِۦ لَا يَسۡتَجِيبُونَ لَهُم بِشَىۡءٍ إِلَّا كَبَـٰسِطِ كَفَّيۡهِ إِلَى ٱلۡمَآءِ لِيَبۡلُغَ فَاهُ وَمَا هُوَ بِبَـٰلِغِهِۦ‌ۚ وَمَا دُعَآءُ ٱلۡكَـٰفِرِينَ إِلَّا فِى ضَلَـٰلٍ۬ (١٤)

অর্থ: একমাত্র তাঁকেই আহবান করা সঠিক৷  আর অন্যান্য সত্তাসমূহ, আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদেরকে এ লোকেরা ডাকে, তারা তাদের প্রার্থনায় কোন সাড়া দিতে পারে না৷ তাদেরকে ডাকা তো ঠিক এমনি ধরনের যেমন কোন ব্যক্তি পানির দিকে হাত বাড়িয়ে তার কাছে আবেদন জানায়, তুমি আমার মুখে পৌঁছে যাও, অথচ পানি তার মুখে পৌঁছতে সক্ষম নয়৷ ঠিক এমনিভাবে কাফেরদের দোয়াও একটি লক্ষভ্রষ্ট তীর ছাড়া আর কিছু নয়৷ (সুরা রাদ-১৩:১৪)।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

. َأَعۡتَزِلُكُمۡ وَمَا تَدۡعُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ وَأَدۡعُواْ رَبِّى عَسَىٰٓ أَلَّآ أَكُونَ بِدُعَآءِ رَبِّى شَقِيًّ۬ا (٤٨)

অর্থ: আমি আপনাদেরকে ত্যাগ করছি এবং আপনারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদেরকে আহবান করেন তাদেরকেও। আমি তো আমার রবকেই আহবান করব৷ আশা করি আমি নিজের রবকে আহবান করে ব্যর্থ হবো না। (মারিয়াম-১৯:৪৮)।

মানুষের ওপর যখন কোন বিপদ আসে তখন সে গাইরুল্লাহ নিকট সাহায্য কামনা করে তাকে আহবান করে। কিন্তু  সে অন্তরে অন্তরে বিশ্বাস রাখে যে, লাভ ও ক্ষতি করার আসল ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহরই হাতে রয়েছে। তাইতো বিপদের কোথাও থেকে সাহায্য না পেয়ে, সত্যিকার সাহায্য পাওয়ার আশায় সে শুধু এক আল্লাহকেই আহবান করে। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَإِذَا مَسَّكُمُ ٱلضُّرُّ فِى ٱلۡبَحۡرِ ضَلَّ مَن تَدۡعُونَ إِلَّآ إِيَّاهُ‌ۖ فَلَمَّا نَجَّٮٰكُمۡ إِلَى ٱلۡبَرِّ أَعۡرَضۡتُمۡ‌ۚ وَكَانَ ٱلۡإِنسَـٰنُ كَفُورًا (٦٧)

অর্থ: যখন সাগরে তোমাদের ওপর বিপদ আসে তখন সেই একজন ছাড়া আর যাকে তোমরা ডাকো সবাই অন্তর্হিত হয়ে যায়৷ কিন্তু যখন তিনি তোমাদের রক্ষা করে স্থলদেশে পৌঁছিয়ে দেন তখন তোমরা তাঁর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও৷ মানুষ সত্যিই বড়ই অকৃতজ্ঞ৷ (সুরা বনী ইসরাঈল ১৭:৬৭)।

 

বিপদে পীর বা অলি আওলিয়াদের আহবান করে এবং তাদের কবরের নিকট গিয়ে কোন কিছু চাওয়া শির্ক এতে কোন প্রকার সন্দেহ নেই। অথচ ব্রেলভীদের একটি অংশ নবী-রাসূল এবং জীবিত ও মৃত অলী-আওলীয়াদের কাছে দুআ করে থাকে। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে দুআ করবে, সে মুশরিক হিসেবে গণ্য হবে। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

وَلَا تَدۡعُ مِن دُونِ ٱللَّهِ مَا لَا يَنفَعُكَ وَلَا يَضُرُّكَ‌ۖ فَإِن فَعَلۡتَ فَإِنَّكَ إِذً۬ا مِّنَ ٱلظَّـٰلِمِينَ (١٠٦)

আর আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন কোন সত্তাকে ডেকো না, যে তোমার না কোন উপকার করতে না ক্ষতি করতে পারে৷ যদি তুমি এমনিটি করো তাহলে জালেমদের দলভুক্ত হবে৷  (সূরা ইউনুস ১০:১০৬)।

 

আল্লাহ তাআলা আরও বলেনঃ

وَمَنۡ أَضَلُّ مِمَّن يَدۡعُواْ مِن دُونِ ٱللَّهِ مَن لَّا يَسۡتَجِيبُ لَهُ ۥۤ إِلَىٰ يَوۡمِ ٱلۡقِيَـٰمَةِ وَهُمۡ عَن دُعَآٮِٕهِمۡ غَـٰفِلُونَ (٥)

সেই ব্যক্তির চেয়ে বেশী পথভ্রষ্ট কে যে আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন সব সত্তাকে ডাকে যারা কিয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়া দিতে সক্ষম নয়৷  এমনকি আহবানকারী যে তাকে আহবান করছে সে বিষয়েও সে অজ্ঞ৷ (সূরা আহকাফ ৪৬:৫)

সঠিক কথা হল, যে সকল বিষয় মহান আল্লাহ ছাড়া আর কেহ দান করতে পারে না। এবং যা মানুষের ক্ষমতার বাইরে, তা মানুষের নিকট চাইলে শির্ক হবে।

মহান আল্লাহ তাআলা বলেন,

قُلۡ أَرَءَيۡتَكُمۡ إِنۡ أَتَٮٰكُمۡ عَذَابُ ٱللَّهِ أَوۡ أَتَتۡكُمُ ٱلسَّاعَةُ أَغَيۡرَ ٱللَّهِ تَدۡعُونَ إِن كُنتُمۡ صَـٰدِقِينَ (٤٠) بَلۡ إِيَّاهُ تَدۡعُونَ فَيَكۡشِفُ مَا تَدۡعُونَ إِلَيۡهِ إِن شَآءَ وَتَنسَوۡنَ مَا تُشۡرِكُونَ (٤١)

অর্থ: এদেরকে বলো, একটু ভেবে চিন্তে বলতো দেখি, যদি তোমাদের ওপর কখনো আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন বড় রকমের বিপদ এসে পড়ে অথবা শেষ সময় এসে যায়, তাহলে সে সময় কি তোমরা আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ডাকো? বলো, যদি তোমরা সত্যবাদী হও৷ (সুরা আনআম ৬:৪০-৪১)।

মহান আল্লাহ তাআলা বলেন,

۞ وَإِذَا مَسَّ ٱلۡإِنسَـٰنَ ضُرٌّ۬ دَعَا رَبَّهُ ۥ مُنِيبًا إِلَيۡهِ ثُمَّ إِذَا خَوَّلَهُ ۥ نِعۡمَةً۬ مِّنۡهُ نَسِىَ مَا كَانَ يَدۡعُوٓاْ إِلَيۡهِ مِن قَبۡلُ وَجَعَلَ لِلَّهِ أَندَادً۬ا لِّيُضِلَّ عَن سَبِيلِهِۦ‌ۚ قُلۡ تَمَتَّعۡ بِكُفۡرِكَ قَلِيلاً‌ۖ إِنَّكَ مِنۡ أَصۡحَـٰبِ ٱلنَّارِ (٨)

অর্থ: মানুষের ওপর যখন কোন বিপদ আসে তখন সে তার রবের দিকে ফিরে যায় এবং তাঁকে ডাকে৷ কিন্তু যখন তার রব তাকে নিয়ামত দান করেন তখন সে ইতিপূর্বে যে বিপদে পড়ে তাঁকে ডাকছিলো তা ভুলে যায় এবং অন্যদেরকে আল্লাহর সমক্ষ মনে করতে থাকে,  যাতে তারা আল্লাহর পথ থেকে তাকে গোমরাহ করে৷ তাকে বলো, তোমার কুফরী দ্বারা অল্প কিছুদিন মজা করে নাও৷ নিশ্চিতভাবেই তুমি দোযখে যাবে৷  (সুরা যুমার ৩৬:৮)।

কাজেই বিপদে ডাকতে হবে একমাত্র আল্লাহকে কেননা তিনি ছাড়া কেহ বিপদ দুর করতে পারবে না। আর যাদের বিপদ উদ্ধারকারী মনে করছে ডাকছে, তারা নিজেরাই নিজেদের রবের নৈকট্যলাভের উপায় খুঁজে বেড়াচ্ছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

قُلِ ٱدۡعُواْ ٱلَّذِينَ زَعَمۡتُم مِّن دُونِهِۦ فَلَا يَمۡلِكُونَ كَشۡفَ ٱلضُّرِّ عَنكُمۡ وَلَا تَحۡوِيلاً (٥٦)

অর্থ: এদেরকে বলো, ডাক দিয়ে দেখো তোমাদের সেই মাবুদদেরকে, যাদেরকে তোমরা আল্লাহ ছাড়া (নিজেদের কার্যোদ্ধারকারী) মনে করো, তারা তোমাদের কোনো কষ্ট দূর করতে পারবে না এবং তা পরিবর্তন করতেও পারবে না৷ (সুরা বনী ঈসরাইল ১৭:৫৬)।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

أُوْلَـٰٓٮِٕكَ ٱلَّذِينَ يَدۡعُونَ يَبۡتَغُونَ إِلَىٰ رَبِّهِمُ ٱلۡوَسِيلَةَ أَيُّہُمۡ أَقۡرَبُ وَيَرۡجُونَ رَحۡمَتَهُ ۥ وَيَخَافُونَ عَذَابَهُ ۥۤ‌ۚ إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ كَانَ مَحۡذُورً۬ا (٥٧)

অর্থ: এরা যাদেরকে ডাকে তারা তো নিজেরাই নিজেদের রবের নৈকট্যলাভের উপায় খুঁজে বেড়াচ্ছে যে, কে তাঁর নিকটতর হয়ে যাবে এবং এরা তাঁর রহমতের প্রত্যাশী এবং তাঁর শাস্তির ভয়ে ভীত। আসলে তোমার রবের শাস্তি ভয় করার মতো৷ (সুরা বনী ইসরাঈল ১৭:৫৭)।

১২। অলি আওলিয়ারা কবরে জীবিত আছেন।

ক। বেরেলভী লিখেছেন: আওলীয়াগন তাদের কবরে অনন্ত জীবনসহ জীবিত। তাদের জ্ঞান ও অনভুতি, শ্রবন ও দৃষ্টিশক্তি তাদের (কবরে) পূর্বের চেয়ে অনেক বেশী হয়। (বাহারে শরিয়ত,আমজাদ আলী, ১ম খন্ড পৃষ্ঠা-৫৮)।

অথচ নিম্নের আয়াতটির মাধ্যমে আল্লাহ্‌ ঘোষণা করেছেন যে, মানুষ মাত্রই মরণশীল এমন কি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও এর উর্দ্ধে নন।

আল্লাহ্‌ সুবাহানাহুয়াতালা বলেনঃ

إِنَّكَ مَيِّتٌ۬ وَإِنَّہُم مَّيِّتُونَ (٣٠)

নিশ্চয়ই তুমিও মারা যাবে, এবং নিশ্চয়ই তারাও মারা যাবে, (জুমার  ৩৯:৩০)।

আল্লাহ্‌ সুবাহানাহুয়াতালা এরশাদ করেন:

وَمَا جَعَلۡنَا لِبَشَرٍ۬ مِّن قَبۡلِكَ ٱلۡخُلۡدَ‌ۖ أَفَإِيْن مِّتَّ فَهُمُ ٱلۡخَـٰلِدُونَ (٣٤)

كُلُّ نَفۡسٍ۬ ذَآٮِٕقَةُ ٱلۡمَوۡتِ‌ۗ وَنَبۡلُوكُم بِٱلشَّرِّ وَٱلۡخَيۡرِ فِتۡنَةً۬‌ۖ وَإِلَيۡنَا تُرۡجَعُونَ (٣٥)

অর্থ: (পৃথিবীতে) তোমার পূর্বেও কোন মানুষকে অনন্ত জীবন দান করা হয় নাই। সুতারাং তোমার মৃত্যু হলে ওরা কি চিরদিন বেঁচে থাকবে ? প্রতিটি আত্মাকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। আমি তোমাদের মন্দ ও ভালো দ্বারা পরীক্ষা করে থাকি। আমারই নিকট তোমরা ফিরে আসবে, (আম্বিয়া ২১:৩৪-৩৫)।

আরওদেখতে পারেন: আনকাবুদ ২৯:৫৭; সাবা ৩৪:১৪; বাকারা ২ : ১৩৩; নিসা ৪:৭৮।

 

বেরেলভী লিখেছেন: ইয়া আলী, ইয়া গাওস বলে ডাকা জায়েয কারন আল্লাহর প্রিয় বান্দারা তাদের বারজাকে (কবরে) শুনতে পান। (হাকায়্যাত রিযভিয়্যাহ)। অথচ মহান আল্লাহ বলেন,

 

ِنَّكَ لَا تُسۡمِعُ ٱلۡمَوۡتَىٰ وَلَا تُسۡمِعُ ٱلصُّمَّ ٱلدُّعَآءَ إِذَا وَلَّوۡاْ مُدۡبِرِينَ (٨٠)

তুমি মৃতদেরকে শুনাতে পারোনা৷ যেসব বধির পিছন ফিরে দৌড়ে পালিয়ে যাচ্ছে তাদের কাছে নিজের আহবান পৌছাতে পারনা৷ (সুরা নমল : ৮০)।

 

১৪। অলি আওলিয়ারা কবরে কাছ ফরিয়াদ করলে শুনতে পান।

অপর বেরেলভী লিখেছেন: মৃতরা শুনেন এবং তাদের মৃত্যুর পর প্রিয়জনদের সাহায্য করে। (ইলমুল কুরআন আহম্মদ ইয়ার)।

যে কোন অবস্থায় আল্লাহ ছাড়া, অলি আওলিয়ারা কবরে কাছ ফরিয়াদ করব শির্ক। তৎকালিন কাফেরগন  বিপদ আপদে, রোগ শোকে জর্জরিত হয়ে গাইরুল্লার কাছে ফরিয়াদ করত। কিন্তু কঠিন কোন বিপদের সম্মুখিন হলে তাদের ও তাদরে বানান বহু উপাস্যর নিকট ফরিয়াদ না করে মহান আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ যানাত। বিপদ মুক্তির পরই আবার বহু উপাস্যর উপসনা করে। কারন মনের গভীরে অন্য উপাস্যদের ক্ষমতা আছে বলে বিশ্বাস করার সাথে সাথে আল্লাহর ক্ষমতার প্রতি ও বিশ্বাস ছিল।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

فَإِذَا رَڪِبُواْ فِى ٱلۡفُلۡكِ دَعَوُاْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ فَلَمَّا نَجَّٮٰهُمۡ إِلَى ٱلۡبَرِّ إِذَا هُمۡ يُشۡرِكُونَ (٦٥)

অর্থ:  যখন তারা নৌযানে আরোহণ করে তখন নিজেদের দ্বীনকে একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্ধারিত করে নিয়ে তার কাছে ফরিয়াদ করে৷ তারপর যখন তিনি তাদেরকে উদ্ধার করে স্থলে ভিড়িয়ে দেন তখন সহসা তারা শির্ক করতে থাকে। (আনকাবুত-২৯:৬৫)।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

إِذۡ تَسۡتَغِيثُونَ رَبَّكُمۡ فَٱسۡتَجَابَ لَڪُمۡ أَنِّى مُمِدُّكُم بِأَلۡفٍ۬ مِّنَ ٱلۡمَلَـٰٓٮِٕكَةِ مُرۡدِفِينَ (٩)

অর্থ: আর সেই সময়ের কথা স্মরণ করো যখন তোমরা তোমাদের রবের কাছে ফরিয়াদ করছিলে৷ জবাবে তিনি বললেন, তোমাদের সাহায্য করার জন্য আমি একের পর এক, এক হাজার ফেরেশতা পাঠাচ্ছি৷ (সূরা আনফাল ৮:৯)।

তাই বিপদ আপদে আল্লাহর পরিবর্তে পীর বা বুজুর্গের কবরের নিকট গিয়ে ফরিয়াদ করা মুশরিকদের একটি গুন। তারা বিভিন্ন দেব দেবির কাছে ফরিয়াদ জানায়।

 

১৫।  কবরে সিজদাহ করে।

 

 

১৬। মিলাদ মাহফিল চলা কালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনে বিশ্বাস করা। (এ  উপলক্ষে মিলাদ মাহফিলের মাঝে কিয়াম করে বা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনের কামনায় চেয়ারের ব্যবস্থা করা)।

মিলাদ মাহফিল চলা কালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনে এমন বিশ্বাস কোন করে ছিল ন। এবং সম্পর্কে কোন কালে কোন বিতর্ক ছিল না। “নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বা অন্য কোন অলীর হাজির নাযির নয়, বরং আল্লাহ তাআলার ক্ষমতা, দর্শন, জ্ঞান ও শুনার দ্বারা সর্বত্র হাজির নাযির”। কুরআন হাদিসের স্পষ্ট বর্নণাকে ভুল মিথ্যা ও মনগড়া ব্যাখ্যা করে মানুষকে বিভ্রান্ত করা খুবই গর্হিত কাজ।  রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনে জম্মের আগে পরে তিনি  এমন জ্ঞানের অধিকারি ছিলেন না। বিভিন্ন নবীদের ঘটনা ও দাওয়াত দান কালে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাজির নাযির ছিল না।

০১.    আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন:

وَمَا كُنتَ بِجَانِبِ ٱلۡغَرۡبِىِّ إِذۡ قَضَيۡنَآ إِلَىٰ مُوسَى ٱلۡأَمۡرَ وَمَا كُنتَ مِنَ ٱلشَّـٰهِدِينَ (٤٤) وَلَـٰكِنَّآ أَنشَأۡنَا قُرُونً۬ا فَتَطَاوَلَ عَلَيۡہِمُ ٱلۡعُمُرُ‌ۚ وَمَا ڪُنتَ ثَاوِيً۬ا فِىٓ أَهۡلِ مَدۡيَنَ تَتۡلُواْ عَلَيۡهِمۡ ءَايَـٰتِنَا وَلَـٰكِنَّا ڪُنَّا مُرۡسِلِينَ (٤٥)

অর্থ: (হে মুহাম্মদ!) তুমি সে সময় পশ্চিম প্রান্তে উপস্থিত ছিলে না৷ যখন মূসাকে এ শরীয়াত দান করেছিলাম এবং তুমি সাক্ষীদের অন্তর্ভুক্তও ছিল না৷ বরং এরপর (তোমার যুগ পর্যন্ত) আমি বহু প্রজন্মের উদ্ভব ঘটিয়েছি এবং তাদের ওপর অনেক যুগ অতিক্রান্ত হয়ে গেছে৷ তুমি মাদয়ানবাসীদের মধ্যেও উপস্থিত ছিলে না, যাতে তাদেরকে আমার আয়াত শুনাতে পারতে কিন্তু আমি সে সময়কার এসব তথ্য জানাচ্ছি৷ (কাসাস ২৮:৪৪-৪৫)

০২. আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন:

ذَٲلِكَ مِنۡ أَنۢبَآءِ ٱلۡغَيۡبِ نُوحِيهِ إِلَيۡكَ‌ۖ وَمَا كُنتَ لَدَيۡہِمۡ إِذۡ أَجۡمَعُوٓاْ أَمۡرَهُمۡ وَهُمۡ يَمۡكُرُونَ (١٠٢)

অর্থ: হে মুহাম্মদ! এ কাহিনী অদৃশ্যলোকের খবরের অন্তরভুক্ত, যা আমি তোমাকে অহীর মাধ্যমে জানাচ্ছি৷ নয়তো, তুমি তখন উপস্থিত ছিলে না যখন ইউসুফের ভাইয়েরা একজোট হয়ে যড়যন্ত্র করেছিল৷  (ইউচুফ ১২:১০২)।

মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে হাজির নাযির বিশ্বাস করলে মুলত মিরাজ অস্বিকার করা হয়। আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন:

سُبۡحَـٰنَ ٱلَّذِىٓ أَسۡرَىٰ بِعَبۡدِهِۦ لَيۡلاً۬ مِّنَ ٱلۡمَسۡجِدِ ٱلۡحَرَامِ إِلَى ٱلۡمَسۡجِدِ ٱلۡأَقۡصَا ٱلَّذِى بَـٰرَكۡنَا حَوۡلَهُ ۥ لِنُرِيَهُ ۥ مِنۡ ءَايَـٰتِنَآ‌ۚ إِنَّهُ ۥ هُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡبَصِيرُ (١)

অর্থ: পবিত্র তিনি যিনি নিয়ে গেছেন এক রাতে নিজের বান্দাকে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আক্সা পর্যন্ত, যার পরিবেশকে তিনি বরকতময় করেছেন, যাতে তাকে নিজের কিছু নিদর্শন দেখান৷আসলে তিনিই সবকিছুর শ্রোতা ও দ্রষ্টা৷ (বনী ইসরাইল ১৭:১)।

মিরাজ হল মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আক্‌সা অতপর সপ্ত আকাশ পাড়ি দিয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের আরশে আজিমে পৌছান। রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সদা সর্বদা হাজির নাযির থাকলেতো আ র আলশে যাওয়ার প্রয়োজন ছিল না। তিনি তো সেখানেই হাজিরই ছিলেন। তাহলে মিরাজ আর রইল কোথায়? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হাজির নাযির বলাটা বাহ্যিকভাবে সম্মানজনক মনে করা হলেও আসলে তা শির্ক, যা একজন মুসলিম কে ইসলাম থেকে বাহির করে দেয়। এর দ্বারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিরাজকে অস্বীকার করা হয়।

ইন্তিকাল পরবর্তী জীবনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিলাদ মাহফিল চলা কালে আগমনে করে বা হাজরি নাজিন থাকেন মনে করলেতো সহিহ হাদিস অস্বীকার করা হবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকাল পরবর্তী জীবন সম্পর্কে বিশেষভাবে কিছু হাদীস বর্ণিত হয়েছে। আবু হুরাইরা (রা.) বলেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

‘‘যখনই যে কেউ আমাকে সালাম করে তখনই আল্লাহ আমার রূহকে আমার কাছে ফিরিয়ে দেন, যেন আমি তার সালামের উত্তর দিতে পারি।’’

[আবূ দাউদ, আস-সুনান ২/২১৮। হাদীসটির সনদ গ্রহণযোগ্য]।
অন্য হাদীসে আবু হুরাইরা (রা) বলেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

‘‘কেউ আমার কবরের কাছে থেকে আমার উপর দরুদ পাঠ করলে আমি শুনতে পাই। আর যদি কেউ দূর থেকে আমার উপর দরুদ পাঠ করে তাহলে আমাকে জানান হয়।’’

(বাইহাকী, হায়াতুল আম্বিয়া ১০৩-১০৫ পৃ.; সাখাবী, আল-কাউলুল বাদী ১৫৪ [সুয়ূতী, আল-লাআলী ১/২৮৩; ইবনু আর্রাক, তানযীহ ১/৩৩৫; দরবেশ হূত, আসনাল মাতালিব, পৃ. ২১৬; শাওকানী, আল-ফাওয়াইদ ২/৪১০; আলবানী, যায়ীফুল জামি, পৃ. ৮১৭,; যায়ীফাহ ১/৩৬৬-৩৬৯পৃ.)।

হাদীসটির একটি সনদ খুবই দুর্বল হলেও অন্য আরেকটি গ্রহণযোগ্য সনদের কারণে ইবনু হাজার, সাখাবী, সুয়ূতী প্রমুখ মুহাদ্দিস এ সনদটিকে সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করেছেন।
১৭। মাধ্যম ছাড়া আল্লাহ পর্যান্ত পৌছান যায় না।

অনেকেই আল্লাহকে পেতে মাধ্যম সাব্যস্ত করতে গিয়ে সীমালংঘন করেছে। মাধ্যমের ভুল ব্যাখ্যা করে হাজার হাজার মানুষকে পথভ্রষ্ট করছে। তাদের যুক্তি, মাধ্যম ছাড়া আল্লাহ পর্যান্ত পৌছান যাবেনা। পুল পারাপারের জন্য ধরনির দরকার, বড় বড় অফিসার বা মন্ত্রীদের কাছে সরাসরি যাওয়া যাবে না, পিএ বা সহকারির মাধ্যম দরকার। বিচরকের কাছে সরাসরি যাওয়া যাবে না, উকিল দরকার। ঠিক তেমনি ভাবে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং অন্যান্য নবী ও নেক্কার ব্যক্তিবর্গকে মাধ্যম না মানলে আল্লাহ তা’আলা তাদের কারো কোন আমল  কবুল করবেননা। যেহেতু রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং অন্যান্য নবী জীবিত নেই তাই কোন না কোন অলী বা নেক্কার ব্যক্তিবর্গকে মাধ্যম মানতে হবে।

তাদের এই যুক্তির অসারতা দেখুন, বড় বড় অফিসার বা মন্ত্রীবর্গ সাধারনত সকল মানূষ সম্পর্কে সমান জ্ঞান রাখে না। তাই তাদের জ্ঞান দান করার জন্য মাধ্যম দরকার। জ্ঞান সল্পতার জন্য সহকারি রাখেন, তারই মাধ্যমে যোগাযোগ করতে বলেন। আমার আল্লাহ কি জ্ঞানের কোন সল্পতা আছে? (নাউজুবিল্লাহ)। মনে করলে ঈমান থাকিনা। আল্লাহ আলেমুল গায়েব, তিনি আমেরিকার রাষ্ট্রপতিকে যেমন চেনেন, ঠিক তেমনি অজপাড়া গায়ের ভিক্ষুকটিকে চেনেন। ভাল করে ভাবেন, দুনিয়ার বিচারক ঘুস খায়, দর্নীতি পনায়ণ, স্বজন প্রীতি করে, সুপারিশ গ্রহন করে। আর এই সকল ফায়দা লোটার জন্য মাধ্যম দরকার হয়। আমার আল্লাহ কি ন্যয় পরায়ণ নয়? (নাউজুবিল্লাহ)। আল্লাহ কি সব বিচারকের চাইতে বড় বিচারকের নন? (সুরা তীন:৮)। তাহলে মাধ্যম কেন? বিচারক যদি ঘটনার সময় উপস্থিত থাকেন তবে উকিলে প্রয়োজন কিসের? এই সকল যুক্তি হল অজ্ঞ মানুষ ঠকানোর যুক্তি।

অথচ আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেন:

وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِى عَنِّى فَإِنِّى قَرِيبٌ‌ۖ أُجِيبُ دَعۡوَةَ ٱلدَّاعِ إِذَا دَعَانِ‌ۖ فَلۡيَسۡتَجِيبُواْ لِى وَلۡيُؤۡمِنُواْ بِى لَعَلَّهُمۡ يَرۡشُدُونَ (١٨٦)

অর্থ: যখন আমার বান্দাগণ আমার সম্বন্ধে তোমাকে জিজ্ঞাসা করে, আমি তো প্রকৃতই [তাদের] অতি নিকটে। যখন আহবানকারী আমাকে ডাকে, আমি প্রত্যেক আহবানকারীর আহবানে সাড়া দেই। সুতরাং তারাও আমার ডাকে সাড়া দিক এবং আমার প্রতি ঈমান আনুক, যাতে তারা সঠিক পথে চলতে পারে । (বাকারা ২:১৮৬)।

আল্লাহ তা’আলার এ বাণীর পরিবর্তে যারা যুক্তিদেয় তাদের বিশ্বাসের সংগতি কতটুকু? এ আয়াত ইঙ্গিত করছে যে, আল্লাহর কাছে পৌঁছার একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে তার উপর সঠিকভাবে ঈমান আনা এবং তার প্রর্দশিত পথে ইবাদাত করা। এ দুটি ছাড়া আল্লাহ সন্তষ্টির আর তৃতিয় মাধ্যম নেই। অনেকে আবার নানন অজুহাত দেখিয়ে বলে অলীরা শুধু অসিলা মাত্র। কুরআনের সুরা মায়েদার ৩৫ নম্বর আয়াত উল্লখ করে বলেন স্বয়ং আল্লাহই অসিলা ধরতে বলেছেন। দেখুন আল্লাহ কি বলেন:

يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱتَّقُواْ ٱللَّهَ وَٱبۡتَغُوٓاْ إِلَيۡهِ ٱلۡوَسِيلَةَ وَجَـٰهِدُواْ فِى سَبِيلِهِۦ لَعَلَّڪُمۡ تُفۡلِحُونَ (٣٥):

অর্থ: হে ঈমানদারগণ তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং তার কাছে অসীলা (পূর্ণ আনুগত্যের মাধ্যমে নৈকট্য) অন্বেষণ কর আর তার রাস্তায় জিহাদ কর যাতে করে তোমরা সফলকাম হতে পার। (সূরা আল-মায়িদাহ্ ৫:৩৫)।

আল্লাহ তাআলা কুরআনে অসীলা শব্দের উল্লেখ করেছেন এবং তা দ্বারা পূর্ণ আনুগত্য করাকেই বুঝিয়েছেন কারণ এটা (অর্থাৎ আল্লাহ তার রাসূলের পূর্ণ আনুগত্যই) একমাত্র মাধ্যম যা তাঁর নৈকট্য দিতে পারে এবং তার রহমতের দরজা খুলতে জান্নাতে প্রবেশ করাতে সক্ষম।

 যারা নেককার বান্দাদেরকে অসীলা হিসাবে গ্রহন করে তাদেইর আল্লাহ তায়ালা পরিহাস করছেন কারন তারা যে সকল নেককার বান্দাদেরকে অসীলা বানাচ্ছে তারা নিজেরাই অসীলা তথা আল্লাহর অনুগত্যের দ্বারা নৈকট্য হাসিলের অধিক মুখাপেক্ষী

আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেন:

أُوْلَـٰٓٮِٕكَ ٱلَّذِينَ يَدۡعُونَ يَبۡتَغُونَ إِلَىٰ رَبِّهِمُ ٱلۡوَسِيلَةَ أَيُّہُمۡ أَقۡرَبُ وَيَرۡجُونَ رَحۡمَتَهُ ۥ وَيَخَافُونَ عَذَابَهُ ۥۤ‌ۚ إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ كَانَ مَحۡذُورً۬ا (٥٧)

অর্থ: এরা যাদেরকে ডাকে তারা তো নিজেরাই নিজেদের রবের নৈকট্যলাভের উপায় খুঁজে বেড়াচ্ছে যে, কে তাঁর নিকটতর হয়ে যাবে এবং এরা তাঁর রহমতের প্রত্যাশী এবং তাঁর শাস্তির ভয়ে ভীত৷আসলে তোমার রবের শাস্তি ভয় করার মতো৷ (সূরা আল-ইসরা ৪১:৫৭)।

অনেকে আবার আল্লাহর সাহায্য সহযোগিতা জন্য স্রষ্টা ও সৃষ্টির মাঝে মাধ্যম মানার চেষ্টা করে। কঠিন বিপদে পড়ে যখন কুল কিনারা পায় না, তখন অজ্ঞ শ্রেণীর মানুষ ছোটে মাযার পানে মাধ্যম ধরার খোজে। এ ব্যাপারটা আরও অত্যন্ত বিপজ্জনক বিষয়। পরিতাপের বিষয় যে, অনেক মুসলমানই এ সম্পর্কে পরিষ্কার কোন ধারণা রাখেনা। ফলে তারা সরাসরি শির্কি কাজে লিপ্ত হচ্ছে। এবং আমরা আল্লাহর সাহায্য সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

আল্লাহ তা’আলা বলেন:

‌ۖ وَكَانَ حَقًّا عَلَيۡنَا نَصۡرُ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ (٤٧)

“আর মু’মিনদের সাহায্য করা আমার দায়িত্ব”। (সূরা আর-রূম ৩০:৪৭)।

আল্লাহ তা’আলা বলেন:

يَـٰٓأَيُّہَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِن تَنصُرُواْ ٱللَّهَ يَنصُرۡكُمۡ وَيُثَبِّتۡ أَقۡدَامَكُمۡ (٧)

হে ঈমান গ্রহণকারীগণ, তোমরা আল্লাহকে সাহায্য করো তাহলে আল্লাহও তোমাদেরকে সাহায্য করবেন ১২ এবং তোমাদের পা সুদৃঢ় করে দিবেন৷ । (সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:৭)।

বড়ই পরিতাপের বিষয় যে, এ সমস্ত অজ্ঞ লোকেরা বিভিন্ন পীর বা অলীদের কে মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করেছে তাদের সত্তার উপর ভরসা করে নেক আমল করা থেকে বিরত থাকছে। অথচ যিনি সমস্ত মানব সন্তানের নেতা, সেই রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে সম্বোধন করে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন:
قُل لَّآ أَمۡلِكُ لِنَفۡسِى نَفۡعً۬ا وَلَا ضَرًّا إِلَّا مَا شَآءَ ٱللَّهُ‌ۚ وَلَوۡ كُنتُ أَعۡلَمُ ٱلۡغَيۡبَ لَٱسۡتَڪۡثَرۡتُ مِنَ ٱلۡخَيۡرِ وَمَا مَسَّنِىَ ٱلسُّوٓءُ‌ۚ إِنۡ أَنَا۟ إِلَّا نَذِيرٌ۬ وَبَشِيرٌ۬ لِّقَوۡمٍ۬ يُؤۡمِنُونَ (١٨٨) ۞

হে মুহাম্মাদ ! তাদেরকে বলো,নিজের জন্য লাভ -ক্ষতির কোন ইখতিয়ার আমার নেই৷ একমাত্র আল্লাহই যা কিছু চান তাই হয়৷ আর যদি আমি গায়েবের খবর জানতাম, তাহলে নিজের জন্যে অনেক ফায়দা হাসিল করতে পারতাম এবং কখনো আমার কোন ক্ষতি হতো না৷ ১৪৫  আমি তো যারা আমার কথা মেনে নেয় তাদের জন্য নিছক একজন সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা মাত্র৷  (সূরা আল-আ’রাফ ৮:১৮৮)।

সুতারং আল্লাহ নৈকট্য লভের প্রধান উপকরন হল ঈমান ও কুরআন সুন্নাহ ভিত্তিক নেক আমল। যদি মনে করে থাকি আত্মিয়তার সম্পর্ক তবে মারাত্ত্বক ভুল করবেন। একটু লক্ষ করুন, ইউসুফ (আ:) –এর পিতা ইয়াকুব (আ:)। ইয়াকুব (আ:) –এর পিতা ইছহাক (আ:)। ইছহাক (আ:) –এর পিতা ইব্রাহীম (আ:)। এই চার জন জলিল কদর নবী  একত্রে মিলে কি তাদের পূর্ব পুরুষ  ইব্রাহীম (আ:) –এর পিতা আজর কে জান্নাতে নিতে পারবেন? নিশ্চয়ই না। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর চাচা, আলীর (রাজি:) বাবা, ফাতিমার (রাজি:) শশুর, হাসান হোসেনের (রাজি:) দাদা, আবু তালিবকে, কি সকলে মিলেও জান্নাতের জন্য সুপারিশকরতে পারবেন? কঠিন প্রশ্ন, এবার একটু ভাবেন আপনার শয়েখ বা পীরের ক্ষমতা কত টুকু?

অনুরুপভাবে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর কলিজার টুকরা কন্যাকে সম্বোধন করে বলেছেনঃ
হে ফাতিমা! আমার কাছে যত সম্পদ আছে তার থেকে যা ইচ্ছা হয় চেয়ে নাও, আমি আল্লাহর কাছে তোমার কোন কাজে আসবনা। (বুখারী ও মুসলিম)।

তবে হ্যা, ঈমান এনে কুরআন সুন্নাহ মোতাবেক জীবন যাপন করলেই আল্লাহ সন্তষ্টি পাওয়া যাবে। এরপর চলার পথে ভুলত্রুটি হওয়া সাভাবিক ব্যপার। এই পাপগুলি আল্লাহর একান্ত ইচ্ছা মাপ করা বা না করা। এখানেই সুপারিশ দরকার। তখই নবী রাসুলগন, কুরআন, সাওম, নেক বান্দাসহ অন্যান্যদের সুপারিশ গ্রহন করা হবে, যাদের কথা সহিহ হাদিস সমুহে উল্লেখ আছে।

আল্লাহ তা’আলা বলেন :

قُلۡ هَلۡ نُنَبِّئُكُم بِٱلۡأَخۡسَرِينَ أَعۡمَـٰلاً (١٠٣) ٱلَّذِينَ ضَلَّ سَعۡيُہُمۡ فِى ٱلۡحَيَوٰةِ ٱلدُّنۡيَا وَهُمۡ يَحۡسَبُونَ أَنَّہُمۡ يُحۡسِنُونَ صُنۡعًا (١٠٤) أُوْلَـٰٓٮِٕكَ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ بِـَٔايَـٰتِ رَبِّهِمۡ وَلِقَآٮِٕهِۦ فَحَبِطَتۡ أَعۡمَـٰلُهُمۡ فَلَا نُقِيمُ لَهُمۡ يَوۡمَ ٱلۡقِيَـٰمَةِ وَزۡنً۬ا (١٠٥)
বলুন: আমি কি তোমাদেরকে আমলের দিক থেকে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্তদের সংবাদ দেব? (তারা হলো ঐ সব লোক) যাদের দুনিয়ার জীবনের সমস্ত প্রচেষ্টা পন্ড হয়ে গেছে, অথচ তারা মনে করত কত সুন্দর কাজই না তারা করছে, তারাই সে সব লোক যারা তাদের রবের আয়াতসমূহ ও তার সাথে সাক্ষাৎকে অস্বীকার করেছে, ফলে তাদের সমস্ত আমল বিনষ্ট হয়ে গেছে, সুতরাং কিয়ামতের দিন তাদের জন্য কোন ওজন স্থাপন করবোনা। (সূরা আল-কাহ্ফ: ১০৩-১০৫)।

 

১৮। অলিদের কাশফ কে তাদের নিজস্ব ক্ষমতা মনে করে।

ব্রেলভীগন দাবি করেন, অলিদের কাশফ তাদের নিজস্ব ক্ষমতা। তাদের মতে, মানুষ আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যমে তার হৃদয়ের পর্দা উঠে যায় এবং তাদের সামনে সৃষ্টি জগতের সকল রহস্য উন্মুক্ত হয়ে যায়। তার অন্তর আত্মা খুলে যায়। এবং এই অন্তর আত্মা খুলে যাওয়া কে তাদের পরিভাষায় কাশফ বলা হয়।

কাশফ হাসিল হয়ে গেলে আল্লাহ এবং সুফী সাধকের মাঝে কোন অন্তরায় থাকে না। তখন তারা জান্নাত, জাহান্নাম, সাত আসমান, জমিন আল্লাহর আরশ, লাওহে মাহফুজ পর্যন্ত ঘুরে আসতে পারেন। তারা গায়েবের সকল খবর, মানুষের অন্তরের অবস্থা এবং সাত আসমানে, জমিনে যা আছে তার সবই জানতে পারেন। তাদের স্বীকৃত যত অলী আওলীয়া আছে তাদের সকলেরেই কাশফ হত। মনে হবে এটা তাদের অলী হওয়ার  একটি শর্থ।

আসুন দেখি কাশফ সম্পর্কে ইসলাম কি বলে?

‘কাশ্ফ’ অর্থ প্রকাশিত হওয়া বা অজানা কোন বিষয় নিজের কাছে প্রকাশিত হওয়া। অর্থাৎ আল্লাহ কর্তৃক তার কোন বান্দার নিকট  তার অজানা এমন কিছুর জ্ঞান প্রকাশ করা যা অন্যের নিকট অপ্রকাশিত। এমনিভাবে কাশফ ইচ্ছাধীন কোন বিষয় নয় যে, তা অর্জন করা শরীয়তে কাম্য হবে  বা সওয়াবের কাজ হবে। তবে অহী হলে তা কেবলমাত্র নবী-রাসূলগণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যেমন আল্লাহ বলেন,

عَـٰلِمُ ٱلۡغَيۡبِ فَلَا يُظۡهِرُ عَلَىٰ غَيۡبِهِۦۤ أَحَدًا (٢٦) إِلَّا مَنِ ٱرۡتَضَىٰ مِن رَّسُولٍ۬ فَإِنَّهُ ۥ يَسۡلُكُ مِنۢ بَيۡنِ يَدَيۡهِ وَمِنۡ خَلۡفِهِۦ رَصَدً۬ا (٢٧

‘তিনি অদৃশ্য জ্ঞানের অধিকারী। তিনি তাঁর অদৃশ্যের জ্ঞান কারু নিকট প্রকাশ করেন না’। ‘তাঁর মনোনীত রাসূল ব্যতীত। তিনি তার (অহীর) সম্মুখে ও পশ্চাতে প্রহরী নিযুক্ত করেন। (সুরা জিন ৭২:২৬-২৭)।

তবে কখনও কখনও রীতি বহির্ভূতভাবে অন্য কারু নিকট থেকে অলৈাকিক কিছু ঘটতে পারে বা প্রকাশিত হতে পারে। যেমন ছাহাবী ও তাবেঈগণ থেকে হয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে যে, এই ‘কাশ্ফ’ কোন নবীর ও ইচ্ছাধীন নয়। এমনকি আমাদের রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামে ও ইচ্ছাধীন ছিল ন।

যেমন, সহিহ বুখারী, খন্ড ৬, অধ্যায় ৬০, হাদিস ৪৩৪। এর একটি ঘটনা সহীহ বুখারীর “তাফসির” অধ্যায়ে বর্ণনা করা হয়েছে এইভাবে, আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল (সাঃ) যয়নাব বিনতে জাহশ (রাঃ), রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর একজন স্ত্রী, এর কাছে মধু পান করতেন এবং সেখানে কিছুক্ষণ থাকতেন। তাই আমি (আয়েশাহ) ও হাফসা একমত হলাম যে, আমাদের যার ঘরেই আল্লাহর রসূল (সাঃ) আসবেন, সে তাঁকে বলবে, আপনি কি মাগাফীর খেয়েছেন? আপনার মুখ থেকে মাগাফীরের গন্ধ পাচ্ছি। (আমরা তাই করলাম) এবং তিনি বললেন, না, বরং আমি যয়নাব বিনতে জাহশ এর ঘরে মধু পান করেছি। তবে আমি কসম করলাম, আর কখনো মধু পান করব না। তুমি এ বিষয়টি আর কাউকে জানাবে না।

আল্লাহ বলেন,

وَإِذۡ أَسَرَّ ٱلنَّبِىُّ إِلَىٰ بَعۡضِ أَزۡوَٲجِهِۦ حَدِيثً۬ا فَلَمَّا نَبَّأَتۡ بِهِۦ وَأَظۡهَرَهُ ٱللَّهُ عَلَيۡهِ عَرَّفَ بَعۡضَهُ ۥ وَأَعۡرَضَ عَنۢ بَعۡضٍ۬‌ۖ فَلَمَّا نَبَّأَهَا بِهِۦ قَالَتۡ مَنۡ أَنۢبَأَكَ هَـٰذَا‌ۖ قَالَ نَبَّأَنِىَ ٱلۡعَلِيمُ ٱلۡخَبِيرُ (٣)

যখন নবী তাঁর একজন স্ত্রীর কাছে একটি কথা গোপনে বললেন, অতঃপর স্ত্রী যখন তা বলে দিল এবং আল্লাহ নবীকে তা জানিয়ে দিলেন, তখন নবী সে বিষয়ে স্ত্রীকে কিছু বললেন এবং কিছু বললেন না। নবী যখন তা স্ত্রীকে বললেন। তখন স্ত্রী বললেনঃ কে আপনাকে এ সম্পর্কে অবহিত করল? নবী বললেনঃ যিনি সর্বজ্ঞ, ওয়াকিফহাল, তিনি আমাকে অবহিত করেছেন। (সুরা আত-তাহরীমের আয়াত -৩)।
আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীগন গোপনে আলাপ করল অথচ তিনি কিছুই জানলেন। তার কাশফ ইচ্ছাধীন ক্ষমতা হলে সঙ্গে সঙ্গে যানতে পারতেন।

কোন এক সফরে ‘আয়িশা (রা) হার হারিয়ে গেল। সাহাবিদের পথে আটকিয়ে রেখে হার খোজ করা হল।   এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পেরেসানিতে ফেললেন। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামক যে উটে তিনি ছিলেন, হার খানা তার নীচে পরে ছিল।  আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাশফ ইচ্ছাধীন ক্ষমতা হলে সঙ্গে সেঙ্গে হার খানা পেয়ে যেতেন।

হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম দীর্ঘদিন পর্যন্ত ছেলে ইউসুফ আলাইহিস সালামে খবর না পাওয়ার কারণে কাঁদতে কাঁদতে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। যদি কাশফ ইচ্ছেধীন কোন কিছু হতো, তাহলে ইয়াকুব আলাইহিস সালাম কাশফের মাধ্যমে খবর পেলেন নিশ্চই।

অনুরূপ কাশফ হওয়ার জন্য বুযুর্গ হওয়াও শর্ত নয়। বুযুর্গ তো দূরের কথা, মুমিন হওয়াও শর্ত নয়। কাশফ তো অমুসলিমদের ও হতে পারে।অতএব এরূপ যদি কোন মুমিন থেকে হয়, তবে সেটা হবে ‘কারামত’। অর্থাৎ আল্লাহ্ তাকে এর দ্বারা সম্মানিত করেন। আর যদি কাফির থেকে ঘটে, তবে সেটা হবে ফিৎনা। অর্থাৎ আল্লাহ এর দ্বারা তার পরীক্ষা নিচ্ছেন যে, সে এর মাধ্যমে তার কুফরী বৃদ্ধি করবে, না তওবা করে ফিরে আসবে।

কাজেই কাশফকে অলিদের নিজস্ব ক্ষমতা মনে করা কুফরি। আল্লাহ তার বান্দদের মাঝে যাকে ইচ্ছা তাকে অদৃশ্যের খবর জানাবেন এটাই স্বাভাবিক।

 

১৯। অলি আওলিয়াদের কারামত ইচ্ছাধীন মনে করা।

ব্রেলভীদের যেহেতু মনে করে অলি আওলিয়াদের নিজস্ব কিছু ক্ষমতা আছে। তাই তারা কারামতের ব্যপারে একটু বাড়াবাড়ি করে। এবং তারা বিভিন্ন সময় দাবি করে থাকে অলী আওলিয়াগন মৃতকে জীবিত করে, অলীদের আদেশে নদ-নদী ও আসমান-যমিনের কাজ পরিচালিত হয়, ইলমে গায়েবের দাবী করে, ভবিশ্যাৎ বর্ননা করে, মায়ের পেটের সন্তানের খবর বলে দেয়, দুরের খবর সেখানে না ‍গিয়েই বলে দেয়, চট্রগ্রাম বসে ভৈরবের খবর বলে দেয় ইত্যাদি। তাদের জীবিত ও মৃত কল্পিত পীর ও অলীদের মর্যাদা বাড়ানোর জন্য তাদের কারামত বর্ণনায় মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করে থাকে। যে সকল কাজ আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ করার ক্ষমতা রাখে না তা কখনও অলীদের কারামত হতে পারে না।

মানুষের হাতে অলৌকিক বা সাধারণ অভ্যাসের বিপরীত কোন ঘটনা ঘটলে তার পিছনে দুটি কারন থাকে। হয় যাদু  না হয় কারামত। যে ব্যক্তি কুরআন ও সুন্নাহ পুর্ণ অনুসরণ করে  তার হাতে যদি সাধারণ অভ্যাসের বিপরীতে কোন কিছু ঘটে তবে বুঝতে হবে এটা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এবং তা কারামত। অপর পক্ষে যে ব্যক্তি কুরআন ও সুন্নাহ পুর্ণ অনুসরণ করে না, তার হাতে যদি সাধারণ অভ্যাসের বিপরীতে কোন কিছু ঘটে তবে বুঝতে হবে এটা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নয় এটা হয় ভেলকিবাজি না হয় যাদু। কাজেই বলা যায় কারামত ও যাদুর মধ্যে পার্থক্য করার জন্য কুরআন ও সুন্নাহ হচ্ছে একমাত্র মাপকাঠি।

 

কারামতে ব্যাপারে আহ্‌লুস্‌ সুন্নাতের বিশ্বাস হচ্ছে: আউলীয়াদের কারামত সত্য এবং তাতে বিশ্বাস করা জরুরি। তবে অলী হওয়ার জন্য কারামত প্রকাশিত হওয়া জরুরী নয়।

তবে মনে রাখতে হবে, আওলিয়াদের কারামত তাদের ইচ্ছাধীন নয়। এটা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের জন্য একটা সম্মান। এমনকি অলীগণ তা জানতেও পারেন না। চ্যলেন্স করে কারামত ঘটানোর ঘটনা সম্পুর্ন মিথ্যা। কারন মহান আল্লাহ কারো কাছে দায় বদ্ধ নয়। এমন কি আমাদের প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নকিটও নয়।

যেমন: মহান আল্লাহর বলেন,

وَلَا تَقُولَنَّ لِشَاْىۡءٍ إِنِّى فَاعِلٌ۬ ذَٲلِكَ غَدًا (٢٣) إِلَّآ أَن يَشَآءَ ٱللَّهُ‌ۚ وَٱذۡكُر رَّبَّكَ إِذَا نَسِيتَ وَقُلۡ عَسَىٰٓ أَن يَهۡدِيَنِ رَبِّى لِأَقۡرَبَ مِنۡ هَـٰذَا رَشَدً۬ا (٢٤)

আর দেখো, কোনো জিনিসের ব্যাপারে কখনো একথা বলো না, আমি কাল এ কাজটি করবো৷ তবে যদি আল্লাহ চান৷ যদি ভুলে এমন কথা মুখ থেকে বেরিয়ে যায় তাহলে সাথে সাথেই নিজের রবকে স্মরণ করো এবং বলো, “আশা করা যায়, আমার রব এ ব্যাপারে সত্যের নিকটতর কথার দিকে আমাকে পথ দেখিয়ে দেবেন৷ (সুরা কাহাব :২৩-২৪)।

কুরআন হাদিসে অসংখ্যা প্রমান আছে, পূর্ববর্তী যুগের অনেক সৎ লোক, সাহাবী, তাবেয়ী এবং পরবর্তী যুগের অনেক সৎ লোকের হাতে আল্লাহ্‌ কারামত প্রকাশ করেছেন। যেমন মারইয়াম আলাইহিস সালাম, আসহাবে কাহাফ, জুরাইজ, আব্বাদ বিন বিশর, উমার বিন খাত্তাব, উসায়েদ ইবনে হুযায়ের এমনি আরও অনেক সাহাবীর হাতে আল্লাহ তাআলা কারামত প্রকাশ করেছেন।

সুতারং আওলিয়াদের কারামত ইচ্ছাধীন মনে করা কুফরি। এ ব্যপারে আহ্‌লুস্‌ সুন্নাতের আকিতা অনুসরণ করা উচিৎ। বাড়াবাড়ি করা ঠিক নয়।

 

২০। তাবিজ কবজে বিশ্বাসি

 

তাবীজ লটকানো, রিং, তাগা পরিধান করা, হাতে লোহা বা রাবারের আংটা লাগানো, সুতা, পুঁতির মালা বা অনুরূপ বস্তু ব্যবহার করা ছোট শির্ক। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

যে ব্যক্তি কোন জিনিষ লটকাবে, তাকে ঐ জিনিষের দিকেই সোপর্দ করে দেয়া হবে, (তিরমিযী, অধ্যায়ঃ কিতাবুত্‌ তিব্ব। শায়খ নাসির উদ্দীন আলবানী (রঃ) হাসান বলেছেন; সহীহুত্‌ তিরমিযী হা নং- ২০৭২ )

কোন এক সফরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একজন লোক পাঠিয়ে বলে দিলেন যেঃ

কোন উটের গলায় ধনুকের রশি বা গাছের ছাল দিয়ে তৈরী হার ঝুলানো থাকলে অথবা যে কোন মালা থাকলে সেটি যেন অবশ্যই কেটে ফেলা হয়, (বুখারী, অধ্যায়ঃ কিতাবুত্‌ তিব্ব)।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

“ঝাড়-ফুঁক করা, তাবীজ লটকানো এবং স্বামী বা স্ত্রীর মাঝে ভালবাসা সৃষ্টির জন্যে যাদুমন্ত্রের আশ্রয় নেয়া শির্ক”, ( আবু দাউদ, অধ্যায়ঃ কিতাবুত্‌ তিব্ব। শায়খ নাসির উদ্দীন আলবানী হাদীছ সহীহ বলেছেন। দেখুনঃ সিলসিলায়ে সহীহা হাদীছ নং- ৬/১১৬১)।

টিকা: এখানে যে ঝাড়ফুঁক করাকে শির্ক বলা হয়েছে, তা দ্বারা শির্কী কালামের মাধ্যমে ঝাড়ফুঁক উদ্দেশ্য। তবে ঝাড়ফুঁক যদি আল্লাহর কালাম, আল্লাহর সিফাত বা সহীহ হাদীছে বর্ণিত কোন বাক্যের মাধ্যমে হয়, তাতে কোন অসুবিধা নেই। কারন সহিহ হাদিস দ্বারা ঝাড়ফুঁক করাকে শরিয়ত সম্মত বলা হয়েছে।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্য এক হাদীছে বলেনঃ

“যে ব্যক্তি তাবীজ লটকালো, আল্লাহ্‌ যেন তার উদ্দেশ্য পূর্ণ না করেন। আর যে ব্যক্তি রুগমক্তির জন্যে শামুক বা ঝিনুকের মালা লটকালো, আল্লাহ্‌ যেন তাকে শিফা না দেন”। (হাকেম, (৪/২১৯। ইমাম আলবানী (রঃ) হাদীছটিকে যঈফ বলেছেন। দেখুনঃ সিলসিলায়ে যঈফা, (৩/৪২৭)।

তিনি অন্য এক হাদীছে বলেনঃ

“যে ব্যক্তি তাবীজ লটকালো সে শির্ক করল”। (মুসনাদে আহমাদ, (৪/১৫৬) ইমাম আলবানী সহীহ বলেছেন, দেখুন সিলসিলায়ে সহীহা হাদীছ নং- (১/৮০৯)।

নবী (সাঃ) এক ব্যক্তির হাতে পিতলের একটি আংটা দেখে বললেনঃ এটি কী? সে বললঃ এটি দুর্বলতা দূর করার জন্যে পরিধান করেছি। তিনি বললেনঃ

“তুমি এটি খুলে ফেল। কারণ এটি তোমার দুর্বলতা আরো বাড়িয়ে দিবে। আর তুমি যদি এটি পরিহিত অবস্থায় মৃত্যু বরণ কর, তাহলে তুমি কখনই সফলতা অর্জন করতে পারবে না”।(মুসনাদে আহমাদ, দেখুনঃ আহমাদ শাকেরের তাহকীক, (১৭/৪৩৫) তিনি হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন)।

হুজায়ফা (রাঃ) দেখলেন এক ব্যক্তির হাতে একটি সুতা বাঁধা আছে। তিনি তা কেটে ফেললেন এবং কুরআনের এই আয়াতটি পাঠ করলেনঃ

অর্থ: “তাদের অধিকাংশই আল্লাহকে বিশ্বাস করে; কিন্তু সাথে সাথে শিরকও করে”। (সূরা ইউসুফঃ ১০৬)

সাঈদ বিন জুবায়ের (রাঃ) বলেনঃ যে ব্যক্তি কোন মানুষের শরীর থেকে একটি তাবীজ কেটে ফেলল, সে একটি গোলাম আযাদ করার ছাওয়াব পেল। সাঈদ বিন জুবায়েরের এই কথাটি নবী (সাঃ) হতে বর্ণিত মারফু হাদীছের পর্যায়র্ভূক্ত।

 

ঈদে মীলাদুন্নবী বা নবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জ্ম্ম উৎসব

 

তাদের বিদআতি আমল আকিদার সংখ্যা বলা খুবই কঠিন কাজ।  তবে একটা বিদআত আলোচনা না করলেই নয় যা তারা ঘটা করে পালন করে থাকে। আর তা হল: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জম্ম দিন কে সব ঈদের শ্রেষ্ঠ ঈদ হিসবে পালন করে। যার নাম রেখেছে “ঈদে মীলাদুন্নবী”। তাদের নিকট সবচেয়ে বড় ঈদ এবং বড় উৎসবের দিন হলো এই দিন। তারা মহা ধুমধামে বিশাল শোভা যাত্রা এবং বিভিন্ন ভক্তিপূর্ণ গান ও আনন্দ-ফূর্তির মাধ্যমে আয়োজন করে থাকে। আর রাসূল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামে মিথ্যা কাহিনী বর্ণনার জন্য এদিন তারা তথাকথিত সীরাত মাহফিলের আয়োজন করে। আজকাল তারা ঈদে মীলাদুন্নবী বা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জ্ম্ম উৎসব পালন কে ফরজ বলেও উল্লেখ করছে।

 

ঈদে মীলাদুন্নবী কি?

ঈদে মিলাদুন্নবী (مَوْلِدُ النَبِيِّ): হল আরবি তিনটি শব্দের সম্মিলিত রূপ। ঈদ, মিলাদ ও নবী এই তিনটি শব্দ নিয়ে এটি গঠিত। আভিধানিক অর্থে ঈদ অর্থ খুশি, মিলাদ অর্থ জন্ম, নবী অর্থ বার্তাবাহক। পারিভাষিক অর্থে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দুনিয়াতে আবির্ভাবের আনন্দকে ঈদে মিলাদুন্নবী বলা হয়। কাজেই ‘‘মীলাদুন্নবী’’ বলতে শুধুমাত্র রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মদিনকে বিশেষ পদ্ধতিতে উদযাপন করাকেই বোঝান হয়। জন্মদিনকে উদযাপন বা পালন বা জন্ম উপলক্ষে কিছু অনুষ্ঠান করাই মীলাদুন্নবী হিসেবে মুসলিম সমাজে বিশেষভাবে পরিচিত।

 

ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করা নিয়ে মুসমানদের মধ্য মতভেদ রয়েছে। তার কারন হল:

১।  ঈদে মিলাদুন্নবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জম্মকে কেন্দ্রকরে পালন করা হয় অথচ  অধিকাংশ মুহাদ্দিস, ইতিহাসবিদ, তাফসির কারক, মুফাস্সির, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জম্ম তারিখ নিয়ে মতভেদ করেছেন। অর্থাৎ কেউ তার সঠিক জম্ম তারিখ নির্ণয় করতে পারেনি।

২। ঈদে মীলাদুন্নবী ইবাদাত মনে করে পালন করা হয়। কিন্তু অধিকাংশ মুসলিম মনে করে এই আমল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে ছিল না। আল্লাহর কিতাব, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাত, সাহাবাদের আমল এবং সম্মানিত তিন যুগের কোন যুগে এর কোন অস্তিত্ব ছিলনা। তাই আমরা এটাকে বিদআত বলি। কারণ যে ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি কমনা করা হবে, কুরআন বা সুন্নায় অবশ্যই তার পক্ষে একটি দলীল থাকতে হবে। আর মীলাদ মাহফিলের পক্ষে এরকম কোন দলীল নেই বলেই এটি একটি বিদআতী ইবাদত, যা হিজরী চতুর্থ শতাব্দীর পর তৈরি করা হয়েছে।

তা হলে প্রশ্ন হল:

১। এই বিদআত কে, কখন এবং কোথায় প্রচলন করে? অর্থাৎ ইহার ঐতিহাসিক পটভুমি কি?

২। মুসলিমদের ঈদ কতটি। এ ব্যপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের  নির্দেশনা কি?

প্রথমে জম্ম তারিখ বিষয়ে আলোচনা করব। অতপর আমলটি বিদআত কি না তা পর্যালোচনা করব। প্রশ্নের উত্তর খুজে আলোচনা শেষ করব।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম তারিখ কোনটি? এ বিষয়ে অনেকগুলো অভিমত পাওয়া যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মের বছর ও বার নিয়ে তেমন কোন মতভেদ না থাকলেওে, জম্মের তারিখ ও মাস নির্দিষ্ট করা নিয়ে অধিকাংশ মুহাদ্দিস ইতিহাসবিদ, তাফসির কারক, মুফাস্সির, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জম্ম তারিখ নিয়ে মতভেদ করেছেন। এ মতানৈক্যের যৌক্তিক কারণও রয়েছে। যেমন:

 

ক. কারো জানা ছিল না যে, এ (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নবজাতক ভবিষ্যতে বড় কিছু হবে? অন্য নবজাতকের জন্মকে যেভাবে নেয়া হত তার জন্মকেও সেভাবে নেয়া হয়েছে। এ জন্য পরিবারের কারো পক্ষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম তারিখ নির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত করে রাখা হয়নি।

 

খ. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জম্মের পূর্বেই তাহার পিতা মারা জান। মাতা ও ছয় বছর পর মারা যান। কাজেই জম্ম তারিখ মনে রাখার মত আপন আর কেই ছিল না।

 

গ. পঞ্চাশ বছর আগের কথা ভাবুন! কত জন মানুষ সঠিকভাবে জম্ম তারিখ জানে? এবার একটু ১৪০০ বছর আগে কথা কল্পনায় নিয়ে আসুন, দেখবেন জম্ম তারিখ মনে রাখা বা লিখে রাখা কতটা অসম্ভব ছিল।

 

ঘ. সবচেয়ে সঠিক ও নির্ভর যোগ্য উৎস হল, কুরআন ও হাদিস। অথচ সেখানে জম্মের দিন সোমবার দিন ছাড়া আর কিছু সহিহ সূত্রে বর্ণিত হয় নি।

 

 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম সম্পর্কিত যে তথ্যগুলোর ব্যাপারে সকলে একমত সেটা হচ্ছে- জন্মের সাল ও বার।

জন্মের সাল: তার জন্মের বছর ছিল “আমুল ফিল” তথা হস্তি বাহিনীর বছর। ইমাম ইবনুল কাইয়ূম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: “এতে কোন সন্দেহ নেই যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার অভ্যন্তরে হস্তি বাহিনীর বছর জন্ম গ্রহণ করেন।” (যাদুল মা‘আদ, পৃষ্ঠা- ১/৭৬।

ইমাম বুখারির উস্তাদ ইবরাহিম ইবনে মুনযির বলেছেন: এ ব্যাপারে কোন আলেম দ্বিমত পোষণ করেননি। খলিফা ইবনে খাইয়্যাত, ইবনুল জাযযার, ইবনে দিহইয়াহ, ইবনুল জাওযি ও ইবনুল কাইয়্যেম প্রমুখ আরেকটু বাড়িয়ে এ মতের উপর সকল সিরাতপ্রণেতার ইজমা (মতৈক্য) উল্লেখ করেছেন।” (সুবুল হুদা ওয়ার রাশাদ ফি সিরাতে খাইরিল ইবাদ (১/৩৩৪-৩৩৫))।

 

জন্মদিন: সোমবার। তিনি সোমবারে জন্ম গ্রহণ করেন, সোমবারে নবুওয়ত পান এবং সোমবারে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।আবু কাতাদা আনসারি (রাদিআল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সোমবারে রোজা রাখার কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। তিনি বলেন: এ দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এ দিনে আমাকে নবুওয়াত প্রদান করা হয়েছে অথবা এ দিনে আমার উপর (অহি) নাযিল হয়েছে।” (সহিহ মুসলিম -১১৬২)।

 

 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মের ব্যাপারে মতবিরোধ হচ্ছে মাস ও তারিখ নিয়ে। এ বিষয়ে আমরা আলেমদের বহু অভিমত জানতে পেরেছি, যেমন:

১। অনেকে মনে করেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মের তারিখ অজ্ঞাত, তা জানা যায় নি, এবং তা জানা সম্ভব নয়। তিনি সোমবারে জন্মগ্রহণ করেছেন এটুকুই শুধু জানা যায়, জন্ম মাস বা তারিখ জানা যায় না। এ বিষয়ে কোন আলোচনা তারা অবান্তর মনে করেন।

 

২।  ২ রা রবিউল আউয়াল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জন্ম গ্রহণ করেন: ইবনে কাছির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: “কেউ কেউ বলেছেন ২ রা রবিউল আউয়াল। ইবনে আব্দুল বারর “ইস্তেআব” গ্রন্থে এ অভিমত উল্লেখ করেন এবং ওয়াকেদি এ বর্ণনাটি আবু মাশার নাজিহ ইবনে আব্দুর রহমান আল-মাদানি থেকেও উদ্ধৃত করেন”। (আস-সিরাতুন নববিয়াহ” (১/১৯৯)। দ্বিতীয় হিজরী শতকের অন্যতম ঐতিহাসিক ও মাগাযী প্রণেতা মুহাদ্দিস আবু মা‘শার নাজীহ ইবন আব্দুর রহমান আস-সিনদী (১৭০হি:) এই মতটি গ্রহণ করেছেন।

 

৩. ৮ ই রবিউল আউয়াল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জন্ম গ্রহণ করেন::  ইবনে কাছির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: “কেউ বলেছেন: ৮ ই রবিউল আউয়াল। হুমাইদি এ বর্ণনাটি ইবনে হাজম থেকে বর্ণনা করেন। আর মালেক, উকাইল ও ইউনুস ইবনে ইয়াযিদ প্রমুখ এটি বর্ণনা করেন জুহরি থেকে, তিনি মুহাম্মদ ইবনে জুবাইর ইবনে মুতয়িম থেকে। ইবনে আব্দুল বারর বলেন, ঐতিহাসিকরা এ মতটিকে সঠিক বলেছেন। হাফেজ মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খাওয়ারজেমি এ তারিখের ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিশ্চিত। হাফেজ আবুল খেতাব ইবনে দিহইয়াহ ‘আত-তানবির ফি মাওলিদিল বাশিরিন নাজির’ গ্রন্থে এ মতটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন”। (আস-সিরাতুন নববিয়াহ (১/১৯৯))।

আল্লামা কাসতাল্লানী ও যারকানীর বর্ণনায় এই মতটিই অধিকাংশ মুহাদ্দিস গ্রহণ করেছেন। এই মতটি দুইজন সাহাবী ইবনে আববাস ও জুবাইর ইবন মুতয়িম রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। অধিকাংশ ঐতিহাসিক ও সীরাতুন্নবী বিশেষজ্ঞ এই মতটি গ্রহণ করেছেন বলে তারা উল্লেখ করেছেন। প্রখ্যাত তাবেয়ী ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে মুসলিম ইবনে শিহাব আয-যুহরী (১২৫হি:) তাঁর উস্তাদ প্রথম শতাব্দীর প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও নসববিদ ঐতিহাসিক তাবেয়ী মুহাম্মাদ ইবনে জুবাইর ইবনে মুতয়িম (১০০হি:) থেকে এই মতটি বর্ণনা করেছেন।

কাসতালানী বলেন: ‘‘মুহাম্মাদ ইবনে জুবাইর আরবদের বংশ পরিচিতি ও আরবদের ইতিহাস সম্পর্কে অভিজ্ঞ ছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম তারিখ সম্পর্কিত এই মতটি তিনি তাঁর পিতা সাহাবী জুবাইর ইবন মুতয়িম থেকে গ্রহণ করেছেন।

৪। ৯ ই রবিউল আউয়াল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জন্ম গ্রহণ করেন:: উস্তাদ মুহাম্মদ আল-খুদারী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: “মিসরের জ্যোতির্বিজ্ঞানী মরহুম মাহমুদ পাশা (মৃত্যু : ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দ) -যিনি একাধারে জ্যোতির্বিজ্ঞান, ভূগোল, গণিতবিদ্যা, বই লেখা ও গবেষণায় পারদর্শী ছিলেন- বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম ছিল সোমবার সকাল বেলা, রবিউল আউয়াল মাসের ৯ তারিখ মোতাবেক এপ্রিল/নিসান-এর ২০ তারিখ, ৫৭১খ্রিষ্টাব্দ। এ বছরটি হস্তি বাহিনীর ঘটনার প্রথম বছর। তিনি জন্ম গ্রহণ করেন বনু হাশেম পল্লীতে আবু তালেবের ঘরে”। (নূরুল ইয়াকিন ফি সিরাতে সাইয়্যেদিল মুরসালিন, পৃষ্ঠা-৯; আরও দেখুন: আর-রাহিকুল মাখতুম (পৃষ্ঠা নং: ৪১)।

 

১০ই রবিউল আউয়াল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জন্ম গ্রহণ করেন: অন্য মতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম তারিখ ১০ই রবিউল আউয়াল। এই মতটি ইমাম হুসাইনের পৌত্র মুহাম্মাদ ইবন আলী আল বাকের (১১৪হি:) থেকে বর্ণিত। দ্বিতীয় শতাব্দীর প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আমির ইবন শারাহিল আশ শা‘বী (১০৪হি:) থেকেও এই মতটি বর্ণিত। ঐতিহাসিক মুহাম্মাদ ইবন উমর আল-ওয়াকেদী (২০৭হি:) এই মত গ্রহণ করেছেন। ইবনে সা‘দ তার বিখ্যাত ‘‘আত-তাবাকাতুল কুবরা’’-য় শুধু দুইটি মত উল্লেখ করেছেন, ২ তারিখ ও ১০ তারিখ। (ইবনে সা’দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা (বৈরুত, দারু এহইয়ায়েত তুরাসিল আরাবী) ১/৪৭)।

ইবনে কাছির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: “কেউ বলেন: ১০ রবিউল আউয়াল। এ মতটি ইবনে দিহইয়াহ তার গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন এবং ইবনে আসাকের এ মতটি আবু জাফর আল-বাকের থেকে এবং মুজালিদ নামক রাবী শা‘বি থেকে বর্ণনা করেন”। (আস-সিরাতুন নববিয়াহ (১/১৯৯)।

 

১২ রবিউল আউয়ালে  রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জন্ম গ্রহণ করেন: ইবনে কাছির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: “কেউ বলেন, ১২ রবিউল আউয়াল। ইবনে ইসহাক এ মতটি উল্লেখ করেন। ইবনে আবু শায়বাহ তার ‘মুসান্নাফ’ গ্রন্থে এ মতটি আফ্‌ফান থেকে, তিনি সাঈদ ইবনে মিনা থেকে, তিনি জাবের ও ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন। তারা উভয়ে বলেছেন: ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হস্তি বাহিনীর বছর, ১২ ই রবিউল আউয়াল, সোমবারে জন্মগ্রহণ করেন। এ দিনেই তাকে নবুওয়াত প্রদান করা হয়, এ দিনেই তার মিরাজ হয়েছিল, এ দিনেই তিনি হিজরত করেছেন এবং এ দিনেই তিনি মারা যান’। জমহুর আলেমদের নিকট এ মতটিই বেশী প্রসিদ্ধ”।(আস-সিরাতুন নববিয়াহ (১/১৯৯)।

এই মতটি হিজরী দ্বিতীয় শতাব্দীর প্রখ্যাত ঐতিহাসিক মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (১৫১হি:) গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেছেন: ‘‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাতীর বছরে রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখে জন্মগ্রহণ করেছেন”।(ইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবীয়্যাহ (মিশর, কায়রো, দারুর রাইয়ান, ১ম সংস্করণ, ১৯৭৮)১/১৮৩)।

এখানে লক্ষণীয় যে, ইবনে ইসহাক সীরাতুন্নবীর সকল তথ্য সাধারণত: সনদ সহ বর্ণনা করেছেন, কিন্তু এই তথ্যটির জন্য কোন সনদ উল্লেখ করেন নি। কোথা থেকে তিনি এই তথ্যটি গ্রহণ করেছেন তাও জানান নি বা সনদসহ প্রথম শতাব্দীর কোন সাহাবী বা তাবেয়ী থেকে মতটি বর্ণনা করেন নি। এ জন্য অনেক গবেষক এই মতটিকে দুর্বল বলে উল্লেখ করেছেন। (মাহদী রেজকুল্লাহ আহমদ, আস-সীরাতুন নাবাবীয়াহ, ১০৯ পৃ)।

 

রমযান মাসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জন্ম গ্রহণ করেন:  জন্মগ্রহণ করেছেন। ৩য় হিজরী শতকের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক যুবাইর ইবনে বাক্কার (২৫৬ হি:) থেকে এই মতটি বর্ণিত। তাঁর মতের পক্ষে যুক্তি হলো যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বসম্মতভাবে রমযান মাসে নবুয়ত পেয়েছেন। তিনি ৪০ বৎসর পূর্তিতে নবুয়ত পেয়েছেন। তাহলে তাঁর জন্ম অবশ্যই রমযানে হবে। (ইবনে সা’দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা ১/১০০-১০১, ইবনে কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া (বৈরুত, দারুল ফিকর, ১ম সংস্করণ, ১৯৯৬) ২/২১৫, আল-কাসতালানী, আহমদ বিন মুহাম্মাদ, আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়্যা (বৈরুত, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যা, ১ম সংস্করণ ১৯৯৬) ১/৭৪-৭৫, আল-যারকানী, শরহুল মাওয়াহিব আল-লাদুন্নিয়্যা (বৈরুত, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যা, ১ম সংস্করণ ১৯৯৬) ১/২৪৫-২৪৮, ইবনে রাজাব, লাতায়েফুল মায়ারেফ, প্রাগুক্ত ১/১৫০, সূত্র:ডঃ আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর) ।

 

৮। কারো কারো মতে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম তারিখ ১৭ই রবিউল আউয়াল।

৯। কারো কারো মতে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম তারিখ ২২ শে রবিউল আউয়াল।

১০। কারো কারো মতে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম রবিউস সানী মাসে।

১১। কারো কারো মতে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম রজব মাসে।

১২। কারো কারো মতে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম তারিখ সফর মাসে।

 

১৩। সমকালীন সিরাতপ্রণেত শফিউর রহমান মোবারকপুরি ৯ রবিউল আউয়াল তারিখটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কারন কিছু কিছু মুসলিম গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদ গবেষণা করে বের করেছেন যে, রবিউল আউয়াল মাসের ৯ তারিখ সোমবার ছিল। তাহলে এটা আরেকটি মত হল। এ মতটিও শক্তিশালী, এ তারিখটি ৫৭১ খৃষ্টাব্দের নিসান (এপ্রিল) মাসের বিশ তারিখ পড়ে।

 

 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওয়াত দিবস ঈদে মীলাদুন্নবী হিসেবে পালন করা কতটুকু যৌক্তিক

 

উপরের আলোচনা হতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মের মাস ও তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে কঠিন মতভেদ আছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। অনেকের মতে তার জন্ম দিন হল ১২ই রবিউল আউয়াল। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে সকলের নিকট সমাদৃত, সহীহ হাদীস নির্ভর বিশুদ্ধতম সীরাতগ্রন্থ হল ‘আর-রাহীক আল-মাখতূম’। নবী করীম সা.  এর জন্ম দিবস সম্পর্কে এ গ্রন্থে বলা হয়েছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  ৫৭১ খৃস্টাব্দে ৯ই রবিউল আউয়াল মোতাবেক ২০ এপ্রিল সোমবার প্রত্যুষে জন্ম গ্রহণ করেন। এটা গবেষণার মাধ্যমে প্রমান করেছেন যুগের প্রখ্যাত আলেম মুহাম্মাদ সুলাইমান আল-মানসূর ও মিশরের প্রখ্যাত জোতির্বিজ্ঞানী মাহমূদ।

তারা গেবষণা করে দেখিয়েছেন, জম্মে বছর (“আমুল ফিল” তথা হস্তি বাহিনীর বছর) ১২ রবিউল আউয়াল তারিখের দিনটা ছিল বৃহস্পতিবার। এবং ৯ই রবিউল আউয়াল তারিখের দিনটা ছিল সোমবার। অপর পক্ষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহীহ হাদীসে নিজেই বলেছেন তার জন্ম সোমবার দিন হয়েছে। মাহমূদ পাশার গবেষণার এ ফল প্রকাশিত হওয়ার পর সকল জ্ঞানী ব্যক্তিরাই তা গ্রহণ করেছেন এবং কেউ তার প্রমাণ খণ্ডন করতে পারেননি। অতএব নবী কারীম সা.  এর জন্ম দিবস হল ৯ই রবিউল আউয়াল। ১২ই রবিউল আউয়াল নয়।

অপর পক্ষে অধিকাংশ আলেমের প্রসিদ্ধ ও বিশুদ্ধ মত হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এগারো হিজরির রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ সোমবার দিন মৃত্যুবরণ করেন। (ইবনে কাছিরের “আস-সিরাহ আন-নববিয়াহ” (৪/৫০৯), ইবনে হাজারের “ফাতহুল বারি” (৮/১৩০)। আল্লাহই ভাল জানেন)।

আর সর্বসম্মতভাবে তার ইন্তেকাল দিবস হল ১২ই রবিউল আউয়াল। যে দিনটিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মোৎসব পালন করা হয় সে দিনটি মূলত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইটি ওয়াসাল্লামের মিলাদ (জন্ম) দিবস বরং তা ছিল তাঁর ওয়াত (মৃত্যু) দিবস। তাই দিনটি ঈদ হিসেবে পালন করার আদৌ কোন যৌক্তিকতা নেই। তা সত্ত্বেও যদি ঈদ পালন করতেই হয় তবে তা ১২ ই রবিউল আউয়াল তারিখে না করে ৯ ই রবিউল আউয়ালে করা যেতে পারে। তাহলে অন্তত সাইয়েদুল মুরসালীন সা.  এর ইন্তেকাল দিবসে ঈদ পালন করার মত ধৃষ্ঠতা ও বেয়াদবির পরিচয় দেয়া হবে না। অবশ্য এটাও কিন্তু বেদআত বলে গণ্য হবে।

 

 

ঈদে মীলাদুন্নবী বিদআত কেন?

ঈদে মীলাদুন্নবীকে বিদআত বলার আগে বিদআত সম্পর্কে সামান্য ধানরা দরকার। কোনটি বিদআত আ কোনটি বিদআত নয়, ইহা নিয়ে চলছে চরম বিভ্রান্তি। আপনি বিদআত বলবেন তো, অন্য কেউ বলবেন বিদআতে হাসানা।

সাথে সাথে বিদআতে হাসানার ফজিলতও বলে পালনের উৎসাত দান করবে।

বিদআতের সঙ্গা জানলেই আর ধোকা খাওয়ার সম্ভাবনা নেই।

আল্লাহ্‌র নিকট ইসলামই হচ্ছে একমাত্র মনোনীত দ্বীন। আল-কুরআনে তিনি বলেন,

﴿ وَمَن يَبۡتَغِ غَيۡرَ ٱلۡإِسۡلَٰمِ دِينٗا فَلَن يُقۡبَلَ مِنۡهُ ﴾ [ال عمران: ٨٥]

‘‘যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোন দ্বীন অনুসন্ধান করে, তা কখনোই তার কাছ থেকে গ্রহণ করা হবে না’’। ( সূরা আলে-ইমরান ৩: ৮৫)।

এ দ্বীনকে পরিপূর্ণ করার ঘোষণাও আল্লাহ্ আল-কুরআনে দিয়েছেন,

﴿ٱلۡيَوۡمَ أَكۡمَلۡتُ لَكُمۡ دِينَكُمۡ وَأَتۡمَمۡتُ عَلَيۡكُمۡ نِعۡمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ ٱلۡإِسۡلَٰمَ دِينٗاۚ ﴾ [المائ‍دة: ٣]

‘‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।’’ ( সূরা আল মায়িদা ৫: ৩)।

 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,  “আমাদের এই দ্বীনের মাঝে যে নতুন কিছু উদ্ভাবন করবে, তা প্রত্যাখ্যাত হবে।” (সহীহুল বুখারী)।

তিনি আরও বলেন: “তোমরা আমার সুন্নাত এবং আমার পরবর্তী খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাত পালন করবে। আর তা দৃঢ়তার সাথে ধারণ করবে। সাবধান! তোমরা দ্বীনের মধ্যে নতুন বিষয় আবিষ্কার করা থেকে বিরত থাকবে। কারণ প্রত্যেক নব প্রবর্তিত বিষয়ই বিদআত এবং প্রত্যেক বিদআতই ভ্রষ্টতা (তিরমিযী, অনুচ্ছেদ: সুন্নত গ্রহণ, ইমাম তিরমিযী বলেন, হাদীসটি হাসান সহীহ)।

 

উপরের কুরআন ও হাদিস থেকে এ কথা স্পষ্ট যে দ্বীনের ব্যাপারে কোন কিছুই নতুন করে উদ্ভাবন করা যাবে না। কারন মহার আল্লাহ দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন। এক জন মুসলিক কি আকিদা রাখবে, কি আমল করবে তা কুরআন সুন্নাহ দ্বারা প্রমানিত হতে হবে। অর্থাৎ আল্লাহ্‌র প্রতি বিশ্বাস, ফিরিশতাগণের প্রতি বিশ্বাস, কিতাব সমূহের প্রতি বিশ্বাস, রাছূলগণের প্রতি বিশ্বাস, শেষ দিনের প্রতি বিশ্বাস ও তাক্বদীরের ভালো-মন্দের প্রতি বিশ্বাস সবগুলিই কুরআন সুন্নাহ দ্বারা প্রমানিত হতে হবে। যুক্তির আলোকে কম বেশী করাই বিদআত। অপর পক্ষে সালত, সাওম, হজ্জ, জাকাত, জিহাদ, তাবলীগ, জিকির ইত্যাদি আমল সমুহ কুরআন সুন্নাহর কষ্ঠি পাথরে যাচাই বাচাই করে আমল করতে হবে।

এ কথা স্পষ্ট যে বিদআত হবে শুধু দ্বীনের ব্যপারে, পার্থিব ব্যপারে নতুন কিছু করলে বিদআত হবে না। পার্থিব বিষয়ে বিদআতের অপর নাম নতুন আবিষ্কৃত বিষয়। আর পার্থিব নতুন আবিষ্কৃত বিষয়ে আমল করাকে কেউ ইবাদাত মনে করে না, তাই এ প্রকার বিদআত বৈধ। কেননা দুনিয়ার সাথে সম্পর্কশীল সকল বিষয়ের ব্যাপারে মূলনীতি হল তা বৈধ। তবে শর্ত হল তাতে শরঈ কোন নিষেধ না থাকা।

দ্বীনের ক্ষেত্রে বিদআত তথা নতুন কিছু উদ্ভাবন করা হারাম। কারণ দ্বীনের ব্যাপারে মূলনীতি হল তা অহীর উপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ দ্বীনের সমস্ত বিধান কুরআন ও সুন্নাহ থেকে গ্রহণ করতে হবে। যখন দ্বীনের ক্ষেত্রে নতুন কিছু উদ্ভাবন করা কে বিদআত মনে করবে তখন বিদআতে আর কোন ভাগ থাকবে না। তখনই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিসের সাথে মিলে যাবে কারন তিনি বলেছেন, “প্রত্যেক বিদআতই ভ্রষ্টতা”। বিদআত শব্দটি সব সময় দ্বীনের সাথে সম্পর্কিত হবে, দুনিয়ার সাথে নয়। দ্বীনের সাথে সম্পর্কিত, আবার ইবাদাত মনে করে নেকির আশায় পালন করি অথচ যে সকল আমল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে, সাহাবী, তাবেয়ী ও তাবে তাবেয়ীদের যুগে ধর্মীয় আমল, আচার বা উৎসব হিসাবে প্রচলিত, পরিচিত ছিল না, পরবর্তী যুগে মুসলিম সমাজে ধর্মীয় আমল হিসাবে প্রচলিত হয়েছে তাই বিদআত। বিদআত হওয়ার শর্ত সমুহ নিম্মরূপ:

 

০১। এমন নতুন ইবাদত আবিষ্কার করা, ইসলামী শরীয়তের মাঝে যার কোন ভিত্তি নেই। অর্থাৎ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লাম ও সাহাবায়ে কিরামের যুগে এর কোন প্রচলন ছিল না এবং এর কোন নমুনাও ছিল না।

০২। শরীয়ত সম্মত ইবাদতের মধ্যে কিছু বৃদ্ধি করা অথবা হ্রাস করা।

০৩। শরীয়ত সম্মত ইবাদাত নতুন নতুন নিয়মে পালন করা।

০৪। সমাজে প্রচলিত বিষয়টিকে দ্বীনের মধ্যে সংযোজন করা এবং ধারণা করা যে, এটি দ্বীনের অংশ।

০৫। অন্য ধর্ম অথবা সংস্কৃতির অনুকরনে নতুন নতুন ইবাদতের পদ্ধতি আবিস্কার করা।

 

অপর পক্ষে দ্বীনের সাথে সম্পর্কিত নয়, আবার ইবাদাত মনে করে নেকির আশায় পালন করি না। সে কাজ কখনই  বিদআত হবেনা। এই মান দন্ড অনুসরন করলে বিদআতের কোন ভাগ করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু আমদের দেশের কিছু কিছু আলেম বিদআতের শ্রণী বিভাগ করেছেন। তারা বলেছেন বিদআত দুই প্রকার। যথা:

১। বিদআতে হাসানা (উত্তম বিদআত)।

২। বিদআতে সাইয়েআ (খারাপ বিদআত)।

তারা আবার উদাহরন দেয় যে, সব বিদআত তথা নতুন কিছু উদ্ভাবিত বিষয় যদি হারাম হয়,  তবে বাসে চড়া বিদাত, প্লেনে হজ্জে যাওয়া বিদআত, মাইকে আজান দেওয়া বিদআত, মসজিদ পাকা করা বিদআত, মাদ্রাসায় পড়ান বিদআত ইত্যাদি ইত্যাদি। তাদের ভাষায় এই গুলি বিআত কিন্তু বিদআতে হাসানা। তার পরেই বলে থাকে অনুরুপভাবে মিলাদ পড়া, খতম করা, কবরে কাপড় জড়ান, মুম বাতি জ্বালান, ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করা বিদআত কিন্তু তা অবশ্যই বিদআতে হাসানা (উত্তম বিদআত)।

লক্ষ করুন উপরের প্রথম উদাহরন গুলী দ্বীনের সাথে সম্পর্কিত নয়, আবার ইবাদাত মনে করে পালন করি না। তাই ঐ কাজ কখনই  বিদআত হবেনা। আবার দ্বিতীয় উদাহরন গুলী লক্ষ করুন, এগুল সরাসরি দ্বীনের সাথে সম্পর্কিত আবার ইবাদাত মনে করে পালন করি। কাজেই এই কাজগুলি বিদআত।

 

এবার উপরের মান দন্ডে পর্যালোচনা করে দেখব ঈদে মীলাদুন্নবী কি বিদআত, না শরিয়ত সম্মত কোন আমল? তাহলে প্রথমে দেখি মীলাদুন্নবীতে কি কি আমল করা হয়।

 

০১। এ দিনে বিশাল বিশাল শোভাযাত্রায় আয়োজন করা হয়। এবং বিভিন্ন ধরনের প্লেকার্ড, পোষ্টার, ফেস্টুন দিয়ে শোভাযাত্রায় সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা হয়। যা মুলত অপচয় ছাড়া আর কিছু নয়। এটা অনেকটা শিয়াদের তাজিয়া মিশিলের অনুকরনে করা হয়ে থাকে।

০২।  এ উপলক্ষে মিলাদ মাহফিলেন আয়োজন করে থাকে যার কোন শরিয়তের ভিত্তি নেই। এবং উক্ত অনুষ্ঠানে এমন কিছু কবিতা আবৃতি করা হয়, যাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ব্যাপারে এমন বাড়াবাড়ি রয়েছে, যা আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে দু’আ করা এবং আশ্রয় প্রার্থনা করা পর্যন্ত নিয়ে যায়।

০৩। তৃতিয় ঈদ মনে করে খাওয়া দওয়ার আয়োজন করে থাকে, যা মুসলেমদের অন্য দুই ঈদের সম পর্যায় নিয়ে যায়। এবং আয়োজোকদের কাছ থেকে এও শুনতে পাোওয়া যায়, ‘ঈদে মীলাদুন্নবী’ সকল ঈদের শ্রেষ্ঠ ঈদ।

৪। কোন কোন সূফীদের দেখা যায় দলবদ্ধভাবে গান-বাজনা করে, ঢোল বাজায় এবং তাদের বানানো বিদআতী নিয়মে বিভিন্ন জিকির-আজকার করে। কখনও কখনও নারী-পুরুষ একত্রিত হয়ে এসমস্ত কাজে অংশ নিয়ে থাকে। যার কারণে অনেক সময় অশালীন কাজকর্ম সংঘটিত হওয়ার সংবাদও শুনা যায়।

৫। ইদানিং দেখা যাচ্ছে শোভাযাত্রায় শেষে এ উপলক্ষে বিশাল সমাবেশের আয়োজন করে থাকে।

৬। অনেকে আবার জলসার আয়োজন করে থাকে, যেখানে তাদের করা পদ্ধতিতে অনুষ্ঠাণ সাজান হয়ে থাকে।

 

তাহলে ঈদে মীলাদুন্নবী বিদআত হওয়ার কারন হলঃ

০১। ঈদে মীলাদুন্নবী এমন একটি নতুন ইবাদত যার কোর ভিত্তি ইসলামী শরীয়তের মাঝে নেই। অর্থাৎ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লাম ও সাহাবায়ে কিরামের যুগে এর কোন প্রচলন ছিল না এবং এর কোন নমুনাও ছিল না।  মীলাদুন্নবী উদযাপনের পক্ষের ও বিপক্ষের সকল আলেম ও গবেষক একমত যে, ইসলামের প্রথম শতাব্দিগুলিতে ‘‘ঈদে মীলাদুন্নবী’’ বা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মদিন পালন করা বা উদযাপন করার কোন প্রচলন ছিল না।

০২। শরীয়ত সম্মত ইবাদতের হল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লামের প্রতি দুরূদ ও সালাম পেশ করা। কিন্তু এর জন্য নতুন নতুন পদ্ধতিতে আদায় করা বিদআতের অন্তরভুক্ত।

০৪। ১২ রবিউল আউয়াল তারিখে ঈদে মীলাদুন্নবী সামনে রেখে এমন গুরুত্ব দেওয়া হয়, যেমন গুরুত্ব ইসলামের অন্যান্য ইবাদতে (হজ্জ, কুরবানী ও ঈদুল ফিতর) দেওয়া হয়। মনে হয় এটি দ্বীনের অংশ। যা সত্যিই দ্বীনের মধ্যে নতুণ সংযোজন।

 

০৫। ঈদে মীলাদুন্নবী হল খৃষ্টানদের বড় দিন, হিন্দুদের জন্মাষ্ঠমী ও বৌদ্ধদের বৌদ্ধ-পূর্ণিমার অনুকরণ। ধর্মীয় বিষয়ে তাদের আচার-অনুষ্ঠানের বিরোধিতা করা ঈমানের দাবী। অথচ ঈদে-মীলাদ পালনের মাধ্যমে তাদের বিরোধিতা না করে অনুসরণ করা হয়।

 

0৬। জন্মদিন ও মৃত্যুদিন পালন করা অনারব সংস্কৃতির অংশ, যা পরবর্তী সময়ে মুসলিম সমাজেও প্রচলিত হয়ে যায়। কোন কোন বর্ণনা থেকে দেখা যায় যে, ৭ম হিজরী শতাব্দীর শেষে এবং ৮ম হিজরী শতকের প্রথমাংশেও মীলাদুন্নবী পালন অনেক দেশের মুসলিমদের কাছে অজানা ছিল। (এহইয়াউস সুনান, আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর)

 

০৭। শাইখ আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায (রঃ) বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বা অন্য কারও জন্মোৎসব পালন করা জায়েজ নয়, বরং তা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। কারণ এটি দ্বীনের মাঝে একটি নতুন প্রবর্তিত বিদআত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনও একাজ করেন নি। তাঁর নিজের বা তাঁর পূর্ববর্তী কোন নবী বা তাঁর কোন আত্মীয়, কন্যা, স্ত্রী অথবা কোন সাহাবীর জন্মদিন পালনের নির্দেশ দেন নি। খোলাফায়ে রাশেদীন, সাহাবায়ে কেরাম অথবা তাবেয়ীদের কেউ একাজ করেন নি। এমন কি পূর্ব যুগের কোন আলেমও এমন কাজ করেন নি। তাঁরা সুন্নাহ সম্পর্কে আমাদের চেয়ে অধিকতর জ্ঞান রাখতেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তার শরীয়ত পালনকে সর্বাধিক ভালবাসতেন। যদি এ কাজটি ছওয়াবের হত, তাহলে আমাদের আগেই তাঁরা এটি পালন করতেন। (ঈদে মীলাদুন নবী (সা.) কেন বিদ’আত? লেখক: আব্দুল্লাহ শাহেদ মাদানী )

০৮। নবম হিজরী শতকের অন্যতম আলেম ও ঐতিহাসিক আল্লামা ইবনে হাজর আল-আসকালানী (মৃত্যু: ৮৫২হি: ১৪৪৯খ্রি:) লিখেছেন: ‘‘মাওলিদ পালন মূলত: বিদ‘আত। ইসলামের সম্মানিত প্রথম তিন শতাব্দীর সালফে সালেহীনদের কোন একজনও এ কাজ করেন নি।’( আস-সালেহী, মুহাম্মাদ বিন ইউসুফ, সুবুলুল হুদা ওয়ার রাশাদ ফী সীরাতি খাইরিল ইবাদ, আস-সীরাতুশ শামিয়্যাহ (বৈরূত, দারুল কুতুব আল- ইলমিয়্যাহ, প্রথম প্রকাশ, ১৯৯৩) ১/৩৬৬)।

০৯। আধুনিক বাংলার অন্যতম আলেমে দ্বীন ডক্টর আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর ‘এহইয়াউস সুনান’ গ্রন্থে লিখেন, আলেমদের এই ঐক্য হল ঈদে মীলাদুন্নবী বিদআত, তাদের ঐক্যমতের কারণ হলো, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শতাব্দীতে সংকলিত অর্ধশতাধিক সনদভিত্তিক হাদীসের গ্রন্থ, যাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কর্ম, আচার-আচরণ, কথা, অনুমোদন, আকৃতি, প্রকৃতি ইত্যাদি সংকলিত রয়েছে, সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীদের মতামত ও কর্ম সংকলিত হয়েছে সে সকল গ্রন্থের একটিও সহীহ বা দুর্বল হাদীসে দেখা যায় না যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায় বা তাঁর মৃত্যুর পরে কোন সাহাবী সামাজিকভাবে বা ব্যক্তিগতভাবে তাঁর জন্ম উদযাপন, জন্ম আলোচনা বা জন্ম উপলক্ষে আনন্দ প্রকাশের জন্য নির্দিষ্ট কোন দিনে বা অনির্দিষ্টভাবে বৎসরের কোন সময়ে কোন অনুষ্ঠান করেছেন।

সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামই ছিলেন তাঁদের সকল আলোচনা, সকল চিন্তা চেতনার প্রাণ, সকল কর্মকান্ডের মূল। তাঁরা রাহমাতুল্লিল আলামীনের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের) জীবনের ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর ঘটনা নিয়ে আলোচনা করেছেন, তাঁর জীবনের বিভিন্ন ঘটনা আলোচনা করে তাঁর ভালবাসায় চোখের পানিতে বুক ভিজিয়েছেন। তাঁর আকৃতি, প্রকৃতি, পোষাক আশাকের কথা আলোচনা করে জীবন অতিবাহিত করেছেন। কিন্তু তাঁরা কখনো তাঁর জন্মদিন পালন করেন নি। এমনকি তাঁর জন্মমুহুর্তের ঘটনাবলী আলোচনার জন্যও তাঁরা কখনো বসেন নি বা কোন দান-সাদকা, তিলাওয়াত ইত্যাদির মাধ্যমেও কখনো তাঁর জন্ম উপলক্ষে আনন্দ প্রকাশ করেন নি। তাঁদের পরে তাবেয়ী ও তাবে তাবেয়ীদের অবস্থাও তাই ছিল।

 

কখন থেকে ঈদে মীলাদুন্নবী পালন হচ্ছে?

মিশরের ইসমাঈলীয় শাসকগণ দ্বারা প্রবর্তিত হলেও ঈদে মীলাদুন্নবী উদযাপনকে সমস্ত মুসলিম বিশ্বে অন্যতম উৎসবে পরিণত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অবদান ইবরিলের শাসক আবু সাঈদ কূকুবূরীর। তাঁকেই আমরা মীলাদ অনুষ্ঠানের প্রকৃত প্রবর্তক বলে মনে করতে পারি। এর অন্যতম প্রমাণ হলো ৪র্থ হিজরী শতকে মিশরে এই উদযাপন শুরু হলে তার কোন প্রভাব বাইরের মুসলিম সমাজগুলোতে পড়ে নি। এমনকি পরবতী ২০০ বৎসরের মধ্যেও আমরা মুসলিম বিশ্বের অন্য কোথাও এই উৎসব পালন করতে দেখতে পাই না। অথচ ৭ম হিজরী শতকের শুরুতে কুকবূরী ইরবিলে ঈদে মীলাদুন্নবী উদযাপন শুরু করলে তা তৎকালীন মুসলিম সমাজগুলিতে সাড়া জাগায়। পরবর্তী ২০০ বৎসরের মধ্যে এশিয়া-আফ্রিকার বিভিন্ন মুসলিম সমাজে অনেক মানুষ ঈদে মীলাদুন্নবী পালন করতে শুরু করে। (‘এহইয়াউস সুনান’)

 

ইসলামে ঈদ হল দুটি যথা: ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা তৃতীয় কোন ঈদ নেই।

সাহাবী আনাস বিন মালিক রাঃ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলে কারীম সা. যখন মদীনায় আসলেন তখন দেখলেন বছরের দুটি দিনে মদীনাবাসীরা আনন্দ-ফুর্তি করছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন এ দিন দুটো কি ? তারা বলল যে আমরা ইসলামপূর্ব মুর্খতার যুগে এ দুুদিন আনন্দ-ফুর্তি করতাম। রাসূলুল্লাহ সা. বললেনঃ “আল্লাহ তাআলা এ দু’দিনের পরিবর্তে এর চেয়ে উত্তম দুটো দিন তোমাদের দিয়েছেন। তা হল ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতর। ( আবু দাউদ)

ইসলামে ঈদ শুধু দু’ টি এ বিষয়টি শুধু সহীহ হাদীস দ্বারাই প্রমাণিত নয়, তা রবং ইজমায়ে উম্মত দ্বারাও প্রতিষ্ঠিত। যদি কেউ ইসলামে তৃতীয় আরেকটি ঈদের প্রচলন করে তবে তা কখনো গ্রহণযোগ্য হবে না। বরং তা দ্বীনের মধ্যে একটা বেদআত ও বিকৃতি বলেই গণ্য হবে।

সার কথা ১২ই রবিউল আউয়ালে ঈদে-মীলাদ উদযাপন করা শরীয়ত বিরোধী কাজ। এ ধরণের কাজ হতে যেমন নিজেদের বাঁচাতে হবে তেমনি অন্যকে বিরত রাখার চেষ্টা করতে হবে।

 

 

সিদ্ধান্ত: যদি তাদের আকিদা বিশ্বাসের ভ্রান্তিগুলি কেউ একত্র করে, তবে বিরাট ভলিউমে বই হয়ে যাবে। বিস্তারিত জানার জন্য পড়তে পারেন, আল্লামা ইহসান এলাহী যহীর, লিখিত “বেরেলভি মতবাদ: আকিদা-বিশ্বাস ও ইতিহাস”, গ্রন্থটি অনুবাদ করছেন আবু রুমাইসা মুহাম্মদ নুর আব্দুল্লাহ হাবিব, প্রকাশক আল-হুদা, পাবনা।

বেরেলভী সম্প্রদায়ের ব্যাপারে সৌদি লাজনা দায়েমার ফৎওয়া : এক প্রশ্নের প্রেক্ষিতে সঊদী আরবের সর্বোচ্চ ফৎওয়া বোর্ড লাজনা দায়েমা থেকে ফৎওয়া দেয়া হয়েছে, “এ ধরনের কুফরী আক্বীদাসম্পন্ন লোকের পিছনে ছালাত আদায় করা যাবে না। যদি তারা মূর্খ হয়, তবে তাদেরকে বুঝানোর চেষ্টা করতে হবে। অন্যথায় তাদের পরিত্যাগ করে আহলে সুন্নাতের কোন মসজিদে ছালাত আদায় করতে হবে”। (ফৎওয়া নং ৩০৯০, ২/৩৯৪-৩৯৬ পৃ:)।  এরা অবশ্য সৌদি আলেমদের ওহবী বলে গালি দেয়। (তথ্যসূত্র : আল্লামা ইহসান এলাহী যহীর, বেরেলভি মতবাদ)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s